চালাক শেয়াল ও বোকা ছাগল – ঈশপের নীতিকথা
চালাক শেয়াল ও বোকা ছাগল ঈশপের (Aesop) লেখা একটি অতি পরিচিত নীতিকথা, যা বাংলায় নৈতিক গল্প হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত। এই গল্পটি আমাদের শেখায়—অন্যের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে নিজস্ব বিবেচনা ও বুদ্ধি প্রয়োগ করা কতটা জরুরি।
এই গল্পটি ইংরেজিতে The Fox and the Goat নামে পরিচিত। বাংলায় একে চালাক শেয়াল ও বোকা ছাগল, বুদ্ধিমান শেয়াল ও নির্বোধ ছাগল ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। নিচে গল্পটি আরও বিস্তারিত ও বর্ণনামূলকভাবে তুলে ধরা হলো।
গল্প: চালাক শেয়াল ও বোকা ছাগল
একদিন দুপুরবেলা। প্রচণ্ড রোদে চারদিক ঝলসে উঠছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটছিল একটি চতুর শেয়াল। অনেকক্ষণ ধরে ঘোরাঘুরি করেও সে খাবার পায়নি। তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ অসাবধানতাবশত শেয়ালটি একটি পুরনো গভীর কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল। কুয়াটি অনেক গভীর হওয়ায় শেয়ালটি লাফিয়ে বের হতে পারছিল না। চারপাশে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল—নিজের শক্তিতে এখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব।
শেয়ালটি তখন খুব চিন্তায় পড়ে গেল। “এখন কী করা যায়?”—এই ভেবে সে কুয়ার ভেতরেই এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। ঠিক তখনই কুয়ার ধারে এসে দাঁড়াল একটি ছাগল।
ছাগলটি কুয়ার ভেতরে উঁকি দিয়ে শেয়ালকে দেখে অবাক হয়ে গেল। সে জিজ্ঞেস করল—
“বন্ধু শেয়াল, তুমি কুয়ার ভেতরে কী করছো?”
চালাক শেয়াল সুযোগ বুঝে মুখে হাসি এনে বলল—
“ওহ বন্ধু, তুমি তো কিছুই জানো না! এই কুয়ার পানিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি পানি। আমি তো আনন্দে এখানে নেমে পান করছি।”
ছাগলটি একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। সে পানির দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই কুয়ার পানি পরিষ্কার ও ঠান্ডা মনে হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার কারণে সেও বেশ তৃষ্ণার্ত ছিল।
একটু চিন্তা করেই সে আর কোনো প্রশ্ন না করে বলল—
“তাহলে আমিও নামছি। আমিও একটু পানি খাই।”
এই কথা বলে বোকা ছাগলটি লাফ দিয়ে কুয়ার ভেতরে নেমে পড়ল। ছাগলটি নামামাত্রই শেয়ালের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল। সে মুহূর্তের মধ্যেই নিজের বুদ্ধি কাজে লাগাল।
শেয়ালটি দ্রুত ছাগলের কাছে এসে বলল—
“বন্ধু, তুমি একটু সোজা হয়ে দাঁড়াও তো। তোমার শিং দুটো বেশ শক্ত মনে হচ্ছে।”
ছাগলটি কিছু না বুঝেই সোজা হয়ে দাঁড়াল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে শেয়ালটি এক লাফে ছাগলের পিঠে, তারপর শিংয়ের উপর উঠে আরেক লাফে কুয়ার বাইরে চলে গেল।
বেরিয়ে এসে শেয়ালটি ধুলো ঝেড়ে হাসতে হাসতে বলল—
“বিদায় বন্ধু! যদি তোমার মাথায় একটু বুদ্ধি থাকত, তাহলে কুয়ায় নামার আগে ভেবে দেখতে—এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা আছে কি না!”
এই কথা বলে শেয়ালটি দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। আর বোকা ছাগলটি কুয়ার ভেতরে একা দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
আরও পড়ুন
গল্পের শিক্ষা (উপদেশ)
এই গল্পের মূল শিক্ষা খুবই স্পষ্ট এবং জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“দুষ্ট ও চালাক মানুষের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা প্রয়োগ করা জরুরি।”
চালাক শেয়াল নিজের বিপদ থেকে বের হওয়ার জন্য অন্যকে ব্যবহার করেছে। আর বোকা ছাগল না ভেবে, না বুঝে কেবল কথার মিষ্টতায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাস্তব জীবনেও আমরা অনেক সময় এমন মানুষের মুখোমুখি হই, যারা নিজেদের স্বার্থে অন্যকে ফাঁদে ফেলে। তাই কোনো প্রলোভনে পড়ার আগে পরিস্থিতি ভালোভাবে বিচার করা খুব দরকার।
নীতিকথা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ঈশপের গল্পগুলো ছোট হলেও এর শিক্ষাগুলো গভীর। শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বড়দের জীবনেও এই গল্পগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য।
চালাক শেয়াল ও বোকা ছাগল গল্পটি আমাদের শেখায়—
- সব কথায় বিশ্বাস করা ঠিক নয়
- বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ
- অন্যের স্বার্থ বোঝার চেষ্টা করা দরকার
- নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে
উপসংহার
চালাক শেয়াল ও বোকা ছাগল শুধু একটি গল্প নয়, এটি জীবনের একটি বাস্তব শিক্ষা। এই গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো কাজ করার আগে শুধু কথার মাধুর্য নয়, তার ফলাফল ও পরিণতিও ভাবা জরুরি।
শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য যেমন এই গল্প উপযোগী, তেমনি বড়দের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা। কারণ বাস্তব জীবনেও চালাক শেয়ালের অভাব নেই।
তাই মনে রাখবেন—বুদ্ধি থাকলে বিপদ এড়ানো যায়, আর অবিবেচনা করলে সহজেই ফাঁদে পড়তে হয়।