দেশে প্রথম চালু আধুনিক সেচব্যবস্থা, কম পানিতে বেশি ফসল
বাংলাদেশের কৃষিতে যুক্ত হলো এক নতুন যুগের সূচনা। নাটোরের বড়াইগ্রামে দেশের প্রথম সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম চালু হতে যাচ্ছে, যা আধুনিক ও পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির এক অনন্য উদাহরণ। এই পদ্ধতিতে পাইপের সঙ্গে সংযুক্ত স্প্রিংকলারের মাধ্যমে ওপর থেকে বৃষ্টির মতো জমিতে পানি সরবরাহ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি চালু হলে বাংলাদেশের কৃষিতে উৎপাদন বাড়বে, পানির অপচয় কমবে এবং সেচ ব্যবস্থায় আসবে আমূল পরিবর্তন।
সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম কী?
সেন্টার পিভোট ইরিগেশন হলো একটি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থা, যেখানে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে পুরো সেচ যন্ত্রটি বৃত্তাকারে ঘুরে জমিতে পানি সরবরাহ করে। এই পদ্ধতিতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ খুবই কম লাগে এবং নির্ভুলভাবে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়।
এই সেচ ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
- একটি কেন্দ্রবিন্দু থেকে যন্ত্রটি বৃত্তাকারে ঘোরে
- স্প্রিংকলারের মাধ্যমে বৃষ্টির মতো পানি ছিটানো হয়
- জমির উঁচু-নিচু অংশে সমানভাবে পানি পৌঁছায়
- কম পানিতে বেশি জমিতে সেচ দেওয়া যায়
উন্নত দেশগুলোতে এই প্রযুক্তি বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হলেও, বাংলাদেশে এই প্রথম বড় পরিসরে এটি চালু হচ্ছে।
কোথায় ও কীভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে?
এই আধুনিক সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার ভবানীপুর এলাকায়, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ইক্ষু খামারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে—
- অস্ট্রিয়ার কারিগরি সহায়তা
- বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর পানাসি প্রকল্পের অর্থায়ন
ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তায় রয়েছে অস্ট্রিয়ার বায়ার কোম্পানি, এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে শেরপা পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং।
আরও পড়ুন
প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়
এই আধুনিক সেচ প্রকল্পের আর্থিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে—
- একটি প্রকল্পে ব্যয়: ১ কোটি ৯৮ লাখ ৫ হাজার টাকা
- দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয়: ৩ কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার টাকা
এই বিনিয়োগকে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কত জমিতে সেচ দেওয়া যাবে?
সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একসঙ্গে বিশাল পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে সক্ষম।
- একটি প্রকল্পে একসঙ্গে ১২৫ একর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব
- কম সময়ে বড় জমিতে সেচ দেওয়া যায়
- পানির অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ভবানীপুর খামারের মোট জমির পরিমাণ ৭০১ একর। প্রথম ধাপে এর মধ্যে ১২৫ একর জমিতে এই আধুনিক সেচ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
কেন এই প্রযুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ?
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজীব আল মারুফ জানান, প্রচলিত গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দিতে গিয়ে কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পানি ব্যবহার করেন। এর ফলে—
- পানির অপচয় হয়
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়
- জমির উর্বরতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়
কিন্তু সেন্টার পিভোট ইরিগেশন ব্যবস্থায় কম পানিতে বেশি জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব, যা পরিবেশ ও কৃষক—দু’পক্ষের জন্যই লাভজনক।
প্রযুক্তিগত সুবিধা ও কার্যকারিতা
বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, এই সেচ যন্ত্রটি চাকার মাধ্যমে জমিতে ঘুরে ঘুরে বৃষ্টির ফোঁটার মতো পানি ছিটায়।
- জমির প্রতিটি অংশে সমান পানি পৌঁছায়
- উঁচু-নিচু জমিতে আলাদা কোনো সমস্যা হয় না
- ফসল দ্রুত ও স্বাস্থ্যকরভাবে বৃদ্ধি পায়
বিএডিসির পাবনা রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ বলেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
কৃষকদের জন্য কী লাভ হবে?
এই আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকরা যেসব সুবিধা পাবেন—
- কম খরচে সেচ সুবিধা
- পানির সাশ্রয়
- সময় সাশ্রয়
- ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি
- পতিত জমি পুনরায় আবাদযোগ্য করা
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২০ একর পতিত জমি আবার চাষের আওতায় আসবে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা
এই প্রকল্পে প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধান ও প্রশিক্ষণে যুক্ত রয়েছেন বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
- চীনের বিশেষজ্ঞ মিস্টার জ্যাক
- ভিয়েতনামের বিশেষজ্ঞ মিস্টার খোয়া
তারা স্থানীয় প্রকৌশলী ও কর্মীদের আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
দেশের কৃষিতে কী পরিবর্তন আসবে?
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এই আধুনিক সেচ ব্যবস্থা দেশে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
- অন্যান্য জেলাতেও এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ
- ভূ-উপরিস্থ পানির সঠিক ব্যবহার
- ফসল উৎপাদনে বিপ্লব
- জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম সারাদেশে চালু করা গেলে—
- বাংলাদেশের কৃষি আরও আধুনিক হবে
- খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়বে
- কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে
- কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর যুগের সূচনা হবে
উপসংহার
নাটোরের বড়াইগ্রামে চালু হওয়া সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম শুধু একটি সেচ প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কম পানি, কম খরচ এবং বেশি উৎপাদনের এই প্রযুক্তি কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি আরও আধুনিক, টেকসই ও লাভজনক হয়ে উঠবে— এটাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা।