বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির একটি বড় অংশ ঘটে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। এই বাস্তবতা আমাদের সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
অনেকেই মনে করেন, এর একটি বড় কারণ হলো—শিশু বয়স থেকেই রাস্তা চলাচলের নিয়ম ও শিষ্টাচার না শেখানো। তাহলে প্রশ্ন আসে, সন্তানকে কোন বয়স থেকে, কীভাবে রাস্তার নিয়ম শেখানো উচিত? বয়সভেদে নিচে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
৩–৫ বছর: পর্যবেক্ষণ ও নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলার সময়
এই বয়সে শিশুরা রাস্তার ঝুঁকি পুরোপুরি বুঝতে পারে না। তবে এই সময়েই নিরাপদ অভ্যাস তৈরি করা সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর।
- অভিভাবকের হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া
- ফুটপাত ধরে হাঁটার অভ্যাস করা
- হঠাৎ রাস্তার দিকে দৌড়ে না যাওয়া
- গাড়ি দেখলে থেমে দাঁড়ানো
গবেষণায় দেখা গেছে, এই বয়সে শেখানো আচরণগত অভ্যাস ভবিষ্যতে শিশুর আচরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
৬–৯ বছর: ট্রাফিক নিয়ম বোঝানোর উপযুক্ত বয়স
এই বয়সে শিশুরা কারণ ও ফলাফল বুঝতে শেখে। তাই এখন নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করে শেখানো জরুরি।
- লাল সিগন্যালে থামতে হয় এবং সবুজ সিগন্যালে রাস্তা পার হতে হয়
- জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করলে কেন নিরাপদ থাকা যায়
- চলন্ত গাড়ির সামনে বা পেছনে দৌড়ানো কেন বিপজ্জনক
- বাস বা গাড়ির খুব কাছে দাঁড়িয়ে না থাকা
ইউনিসেফের গবেষণা অনুযায়ী, গল্প ও বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শেখালে শিশুরা নিয়ম বেশি মনে রাখতে পারে।
১০–১৩ বছর: বাস্তব ঝুঁকি ও দায়িত্ববোধ তৈরি
এই বয়সে অনেক শিশু একা স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করে। তাই নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব ধীরে ধীরে তাদের হাতে তুলে দিতে হয়।
- বাসে ওঠার সময় ধাক্কাধাক্কি না করা
- বাস বা গাড়ি থেকে নামার আগে ভালোভাবে চারপাশ দেখা
- রাস্তায় হাঁটার সময় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার না করা
আরও পড়ুন
গাড়ি বা বাস থেকে নামার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
শিশুদের অবশ্যই শেখাতে হবে—গাড়ি বা বাস থেকে নামার সময় প্রথমে বাম পা দিয়ে নামতে হয়।
- বাম পা আগে নামালে শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকে
- ডান পাশ দিয়ে নামলে চলন্ত যানবাহনের ধাক্কা লাগার ঝুঁকি বাড়ে
- বাস বা গাড়ি থেকে নামার সময় তাড়াহুড়া না করা
এই ছোট নিয়মটি শেখানো অনেক বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
কখন ও কীভাবে শেখাবেন
সন্তানকে রাস্তার নিয়ম শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর সময় হলো—
- স্কুলে যাওয়া-আসার পথে
- বাস, রিকশা বা গাড়িতে চলার সময়
- রাস্তা পার হওয়ার বাস্তব মুহূর্তে
এই সময় বাস্তব উদাহরণ দেখিয়ে বোঝানো সবচেয়ে কার্যকর। শুধু ভয় দেখানো নয়, বরং কেন এই নিয়ম মানা দরকার—তা ব্যাখ্যা করা উচিত।
অভিভাবকের আচরণই সবচেয়ে বড় শিক্ষা
সব নিয়ম শেখানোর পরও বাস্তব জীবনে ফুটপাত দখল, ট্রাফিক আইন না মানা এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে শিশুর ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই অভিভাবকদের নিজেদের আচরণ দিয়েই দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।
- নিজে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করা
- লাল বাতি অমান্য না করা
- রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোন ব্যবহার না করা
গবেষণা বলছে, শিশুরা উপদেশের চেয়ে অনুকরণ থেকেই বেশি শেখে।
শেষ কথা
রাস্তার নিয়ম শেখানো কোনো একদিনের কাজ নয়—এটি একটি ধারাবাহিক শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই সচেতনতা তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আজ আপনি আপনার সন্তানকে যেভাবে রাস্তা চলতে শেখাবেন, সেটিই আগামী দিনের নিরাপদ নাগরিক গড়ে তোলার ভিত্তি।