ডিএনসিসির বাড়িভাড়া নির্দেশিকা: ২ বছর ভাড়া বাড়ানো যাবে না, ছাদ ও গেটের চাবি দিতে হবে
ঢাকায় বাসাভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, বিরোধ ও অনিয়মের অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের অধিকার সুরক্ষায় বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ডিএনসিসি একটি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্দেশিকাটি প্রকাশ করেন। এই নির্দেশিকায় বাড়িভাড়া, চুক্তি, নিরাপত্তা, ভাড়া বৃদ্ধি ও উচ্ছেদ সংক্রান্ত স্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাড়িওয়ালাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী বাড়িওয়ালাদের বাড়ি ব্যবস্থাপনায় একাধিক বাধ্যবাধকতা মানতে হবে, যাতে ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তা ও বসবাসের মান নিশ্চিত হয়।
- বাড়ি বসবাসের উপযোগী অবস্থায় রাখতে হবে
- পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ সব ইউটিলিটি সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে
- নিয়মিত গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখতে হবে
- ছাদ, বারান্দা ও সামনের খোলা জায়গায় সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে
- অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
- প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদ ও মূল গেটের চাবি দিতে হবে
ডিএনসিসি জানিয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থেই ছাদ ও মূল গেটের চাবি ভাড়াটিয়ার অধিকার।
ভাড়াটিয়ার জন্য নতুন নিয়ম
নির্দেশিকায় ভাড়াটিয়াদের দায়িত্ব ও অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে
- ভাড়া দেওয়ার সময় স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রশিদ সংগ্রহ করতে হবে
- বাড়িতে যেকোনো সময় প্রবেশের অধিকার ভাড়াটিয়ার থাকবে
- নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো পরিবর্তনের আগে ভাড়াটিয়ার সম্মতি নিতে হবে
দুই বছর আগে ভাড়া বাড়ানো যাবে না
নির্দেশিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিক হলো ভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ।
চুক্তির কার্যকর তারিখ থেকে ২ বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না।
২ বছর পর ভাড়া বাড়াতে হলে—
- দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে
- বাজারমূল্যের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যাবে
- ভাড়া বৃদ্ধির সময় নির্ধারিত থাকবে জুন-জুলাই মাসে
আরও পড়ুন
ভাড়া না দিলে কী হবে?
ভাড়াটিয়া নির্ধারিত সময়ে ভাড়া পরিশোধ না করলে বাড়িওয়ালাকে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নিতে হবে।
- প্রথমে মৌখিকভাবে সতর্ক করতে হবে
- পরবর্তীতে লিখিতভাবে তাগাদা দিতে হবে
- তাতেও সমাধান না হলে ২ মাসের লিখিত নোটিশ দিতে হবে
- এরপর চুক্তি বাতিল করে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে
আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই ২ মাসের নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
অগ্রিম ভাড়ার সীমা নির্ধারণ
নতুন নির্দেশিকায় অগ্রিম ভাড়া নেওয়ার বিষয়েও স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না
- এর বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না
লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক
বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে লিখিত চুক্তি থাকা বাধ্যতামূলক। এই চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে—
- মাসিক ভাড়ার পরিমাণ
- ভাড়া বৃদ্ধির শর্ত
- অগ্রিম জমার পরিমাণ
- চুক্তির মেয়াদ
- কখন ও কীভাবে বাড়ি ছাড়তে হবে
ওয়ার্ডভিত্তিক সমিতিতে সমাধান
ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশিকায় নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
- প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠন করতে হবে
- প্রথমে এই সমিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে
- সমাধান না হলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে হবে
কেন এই নির্দেশিকা গুরুত্বপূর্ণ?
এই নির্দেশিকার মাধ্যমে ঢাকার বাসাভাড়া ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষিত হবে
- বাড়িওয়ালাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে
- ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে হয়রানি কমবে
- ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ আইনি কাঠামোয় আসবে
- নগরজীবনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে
ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের জন্য বার্তা
ডিএনসিসি জানিয়েছে, এই নির্দেশিকা ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
নির্দেশিকাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যেকোনো সমস্যা হলে জোনভিত্তিক আলোচনা সভার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলা হয়েছে।
উপসংহার
ডিএনসিসির নতুন বাড়িভাড়া নির্দেশিকা রাজধানীর বাসাভাড়া ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দুই বছর ভাড়া না বাড়ানো, ছাদ ও মূল গেটের চাবি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, লিখিত চুক্তি ও ভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ—সব মিলিয়ে এটি ভাড়াটিয়াদের জন্য বড় স্বস্তির খবর।
এই নির্দেশিকা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে ঢাকায় ভাড়া সংক্রান্ত ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।