মশা কি সত্যিই আপনাকেই বেশি কামড়ায়? কারণ ও বাঁচার উপায়
সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছেন। চারপাশে গল্প, হাসি আর আড্ডার আমেজ। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলেন— অন্যরা দিব্যি গল্পে মেতে থাকলেও মশার দল যেন আপনাকেই নিশানা করছে।
যে জায়গাতেই যান, মনে হয় মশার আনাগোনা শুধু আপনাকে ঘিরেই। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—
মশা কি সত্যিই আপনাকে অন্যদের চেয়ে বেশি কামড়ায়, নাকি এটা শুধু আপনার অনুভূতি?
উত্তর হলো— হ্যাঁ, মশা আপনাকে আসলেই বেশি কামড়াতে পারে।
গবেষণা বলছে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ মশার এই অতিরিক্ত ‘ভালোবাসা’র শিকার।
মশা বেশি কেন কামড়ায়?
কেন কাউকে বেশি, কাউকে তুলনামূলক কম কামড়ায় মশা— এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের অনেককেই হতে হয়।
কারো গায়ে মশার ভিড় লেগেই থাকে, আবার কেউ আশপাশে মশা থাকলেও অনেকটাই রেহাই পান।
এই পার্থক্যের পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
শুধু স্ত্রী মশারাই কেন কামড়ায়?
সব মশা কিন্তু কামড়ায় না।
শুধু স্ত্রী মশারাই কামড়ায়।
কারণ— ডিম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তারা মানুষের রক্ত থেকেই সংগ্রহ করে।
আর শিকার খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে স্ত্রী মশাদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রখর।
কার্বন-ডাই-অক্সাইডই সবচেয়ে বড় সংকেত
কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂) মশার জন্য সবচেয়ে বড় সংকেত।
মানুষ শ্বাস নেওয়ার সময় শরীর থেকে যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, স্ত্রী মশা সেটি খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারে।
যাদের শরীর থেকে তুলনামূলক বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, মশারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়।
এই কারণেই—
- যাদের ওজন বেশি
- যারা দ্রুত শ্বাস নেন
তাদের মশার কামড় তুলনামূলকভাবে বেশি খেতে হয়।
একইভাবে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রেও মশার কামড়ের প্রবণতা বেশি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০০ সালের দিকে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের তুলনায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মশা কামড়ানোর হার প্রায় দ্বিগুণ।
ঘাম, গরম ও ব্যায়াম
ব্যায়াম করার পর বা প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রমের পর মশার কামড় বেশি খেতে হয়।
এর কারণ—
- শরীর থেকে ল্যাকটিক অ্যাসিড নিঃসৃত হয়
- শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে
- ঘামের গন্ধ তৈরি হয়
এই সব সংকেত মশার কাছে খুব সহজেই ধরা পড়ে।
তাই ব্যায়াম শেষে খোলা জায়গায় থাকলে মশার কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
Download Links Below:
জিনগত প্রভাব
জিনগত কারণেও কারো কারো ত্বক থেকে এমন কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা মশাকে বেশি আকৃষ্ট করে।
অর্থাৎ— আপনি চাইলেও এই বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।
একই পরিবেশে থেকেও কেউ বেশি কামড় খায়, কেউ কম—এর পেছনে জিনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
রক্তের গ্রুপও গুরুত্বপূর্ণ
অদ্ভুত শোনালেও সত্য— মশারাও রক্তের স্বাদে পার্থক্য বোঝে।
গবেষণায় দেখা গেছে—
- ‘O’ গ্রুপ
- ‘AB’ গ্রুপ
এই দুই রক্তের গ্রুপ বিশেষ করে এশীয় মশাদের কাছে তুলনামূলক বেশি প্রিয়।
ফলে আপনার রক্তের গ্রুপ যদি মশার পছন্দের তালিকায় থাকে, তাহলে আপনি খুব সহজেই তাদের ‘ফেভারিট’ হয়ে উঠতে পারেন।
যেভাবে নিজেকে বাঁচাবেন
মশার কামড় শুধু বিরক্তিকরই নয়, বরং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মতো ভয়ংকর রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়।
যেসব কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সেগুলোর দিকেই নজর দেওয়া সবচেয়ে জরুরি।
- ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা
- কোথাও পানি জমতে না দেওয়া
- আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা
- মশা তাড়ানোর প্রাকৃতিক উপায় ব্যবহার
- হাত-পায়ের খোলা জায়গায় মশা নিরোধক লোশন ব্যবহার
রক্তের গ্রুপ বা জিন বদলানো না গেলেও, সম্মিলিত সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাসের মাধ্যমে মশার কামড়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
উপসংহার
মশা আপনাকে বেশি কামড়াচ্ছে— এটা কেবল অনুভূতি নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
নিজের শরীরের বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ ও অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন থাকলেই মশার হাত থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যায়।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, ভেরিওয়েল মাইন্ড