বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে। কারণ এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি পোস্টাল ব্যালট-এর মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
আজকের এই লেখায় আমরা জানবো—পোস্টাল ভোট কী, কারা এই ভোট দিতে পারবেন এবং সঠিক নিয়মে ধাপে ধাপে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি কী।
পোস্টাল ভোট বলতে কী বোঝায়?
সাধারণত ভোটারদের সশরীরে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দিতে হয়। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যখন ভোটকেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব হয় না, তখন ডাকযোগে ভোট দেওয়ার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাকেই পোস্টাল ভোট বা ডাকযোগে ভোটদান বলা হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচনে এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) “Postal Vote BD” নামের একটি আধুনিক মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ডাকসেবার সমন্বয় ঘটিয়েছে।
কারা পোস্টাল ভোট দিতে পারবেন?
নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী সব নাগরিক পোস্টাল ভোট দিতে পারবেন না। নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির ভোটারদের জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য। তারা হলেন—
- প্রবাসী বাংলাদেশি: যারা বিদেশে বসবাস করছেন এবং সেখানে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত
- নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা: যারা ভোটের দিন নিজ এলাকার বাইরে দায়িত্ব পালন করবেন
- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য: পুলিশ, আনসারসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য
- আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি: যারা জেলখানা বা অন্য আইনি হেফাজতে রয়েছেন
২০২৬ জাতীয় নির্বাচনে পোস্টাল ভোট নিবন্ধনের পরিসংখ্যান
২০২৬ সালের নির্বাচনে পোস্টাল ভোট নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী—
- মোট ১৫,৩৩,৬৮২ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন
- নিবন্ধন কার্যক্রম চলে ১৮ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০২৬ রাত ১২টা পর্যন্ত
- সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে সৌদি আরব থেকে (২,৩২,৬২০ জন)
- এরপর রয়েছে মালয়েশিয়া, কাতার ও ওমান
- বিশ্বের প্রায় ১৪৮টি দেশ থেকে প্রবাসীরা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন
পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের নিয়ম (ধাপে ধাপে)
ধাপ–১: ব্যালট পেপার গ্রহণ
নিবন্ধিত ঠিকানায় ডাকযোগে একটি বড় খাম পাঠানো হবে। এর ভেতরে থাকবে—
- ব্যালট পেপার (ফরম–৭)
- ঘোষণা ফরম (ফরম–৮)
- একটি ছোট খাম
আরও পড়ুন
ধাপ–২: কিউআর কোড স্ক্যান
খাম পাওয়ার পর Postal Vote BD অ্যাপে লগইন করে খামের ওপর থাকা QR কোড স্ক্যান করুন। এর মাধ্যমে আপনার ব্যালট সিস্টেমে সক্রিয় হবে।
ধাপ–৩: ঘোষণা ফরম পূরণ
ফরম–৮ (Declaration Form) সঠিকভাবে পূরণ করুন এবং স্বাক্ষর দিন। পরিচয় নিশ্চিত করতে এতে আপনার এনআইডি (NID) নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
ধাপ–৪: ভোট প্রদান
ব্যালট পেপার (ফরম–৭)-এ আপনার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের পাশের খালি ঘরে টিক বা ক্রস চিহ্ন দিন।
ধাপ–৫: খাম সিলগালা
প্রথমে শুধু ব্যালট পেপারটি ছোট খামে (ফরম–১০ক) ভরে মুখ বন্ধ করুন। এরপর এই ছোট খাম এবং পূরণকৃত ঘোষণা ফরম (ফরম–৮) একসাথে বড় রিটার্ন এনভেলাপে (ফরম–১০) ভরুন।
ধাপ–৬: ডাকযোগে প্রেরণ
খামটি নিকটস্থ পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন।
পোস্টাল ভোটের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা
আপনার ভোট যেন বাতিল না হয়, সে জন্য নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মেনে চলুন—
- গোপনীয়তা রক্ষা: ব্যালট পেপারের ছবি তোলা বা শেয়ার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- স্বাক্ষর নিশ্চিত করুন: ফরম–৮-এ স্বাক্ষর বা তথ্য ভুল হলে ভোট বাতিল হবে
- প্রতীক বরাদ্দের পর ভোট দিন: এর আগে ভোট দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না
- সঠিক ঠিকানা ব্যবহার: ব্যালট ট্র্যাকিংয়ের জন্য অ্যাপে সচল ঠিকানা দিন
গোপনীয়তা ভঙ্গ করলে আপনার NID কার্ড ব্লক করা হতে পারে—এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন।
শেষ কথা
পোস্টাল ভোট প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সঠিক নিয়ম মেনে ভোট প্রদান করলে আপনার ভোট নিরাপদ থাকবে এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।
অতিরিক্ত তথ্য বা সহায়তার জন্য সরাসরি নির্বাচন কমিশনের হেল্পডেস্কে যোগাযোগ করা যেতে পারে।