দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি: হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে হাইকোর্ট জানিয়েছে যে দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না, যদি আইন অনুযায়ী আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমোদন থাকে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন এটি ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আবার কেউ বলছেন এতে পারিবারিক জটিলতা বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি— এই বক্তব্যটি এখন আর শুধু সামাজিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যার অংশ।
আগে অনেকেই মনে করতেন, প্রথম স্ত্রীর লিখিত সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না। হাইকোর্টের এই রায়ে সেই ধারণার বড় পরিবর্তন এসেছে।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব— নতুন রায়টি কী বলছে, আগের আইন কী ছিল, ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি কীভাবে দেখা হয় এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব কী হতে পারে।
দ্বিতীয় বিয়ে মানে কী?
দ্বিতীয় বিয়ে বলতে বোঝায়, একজন বিবাহিত ব্যক্তি তার প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আরেকটি বিবাহ করা।
বাংলাদেশে এই বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুসলিম পারিবারিক আইনের আওতায় আসে, কারণ ইসলামে নির্দিষ্ট শর্তে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে সমাজে দ্বিতীয় বিয়ে অনেক সময় সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক পরিবারে এটি মানসিক চাপ, পারিবারিক অশান্তি এবং আর্থিক টানাপোড়েনের আশঙ্কা তৈরি করে।
আইন কেবল অনুমতি দেয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে এর প্রভাব অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
আরও পড়ুন
কেন দ্বিতীয় বিয়ে করতে স্ত্রীর অনুমতি লাগে বলে মনে করা হতো
দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মধ্যে একটি ধারণা ছিল— দ্বিতীয় বিয়ের আগে অবশ্যই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে।
এই ধারণার পেছনে ছিল ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ।
এই আইনে বলা হয়েছিল, স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তাহলে তাকে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের কাছে আবেদন করতে হবে এবং সেই আবেদনে প্রথম স্ত্রীর মতামত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
এই বিধানের উদ্দেশ্য ছিল প্রথম স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করা, যাতে স্বামী ইচ্ছামতো আরেকটি বিয়ে করে পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
কিন্তু আইনের ভাষা ও সাধারণ মানুষের বোঝার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য ছিল।
দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি: হাইকোর্ট কী বলেছে
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— মুসলিম পারিবারিক আইনে কোথাও সরাসরি লেখা নেই যে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না।
আইনে বলা হয়েছে, স্বামীকে অবশ্যই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। এই কাউন্সিল পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখবে দ্বিতীয় বিয়ের যুক্তিসংগত কারণ আছে কি না।
দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি— এর মানে এই নয় যে প্রথম স্ত্রীর মতামত একেবারেই গুরুত্বহীন।
আরবিট্রেশন কাউন্সিল প্রথম স্ত্রীর বক্তব্য শুনতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি স্ত্রীর হাতে নয়, বরং আইনি কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে।
এই রায়ের মাধ্যমে আদালত আইনের ভুল ব্যাখ্যাটি পরিষ্কার করেছে।
দ্বিতীয় বিয়েতে ইসলামের বিধান
ইসলাম পুরুষকে চারটি পর্যন্ত বিয়ের অনুমতি দিয়েছে, তবে কঠোর শর্তের সঙ্গে।
কোরআনে বলা হয়েছে, যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করা সম্ভব না হয়, তবে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম।
অর্থাৎ শুধু ইচ্ছা হলেই দ্বিতীয় বিয়ে করা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
ইসলামে দ্বিতীয় বিয়ে অনেক সময় বিশেষ পরিস্থিতিতে সমাধান হিসেবে দেখা হয়, যেমন নিঃসন্তানতা বা পারিবারিক বিশেষ প্রয়োজনে।
তবে সব স্ত্রীর প্রতি সমান ভরণপোষণ, সমান সম্মান এবং ন্যায়বিচার করা ফরজ।
বাংলাদেশের আইন মূলত ইসলামের এই নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্য রেখে তৈরি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিয়ের জন্য কি স্ত্রীর অনুমতি লাগবে?
উত্তর: না। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়, তবে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি লাগবে।
প্রশ্ন: আরবিট্রেশন কাউন্সিল কী?
উত্তর: এটি একটি আইনি কর্তৃপক্ষ, যারা দ্বিতীয় বিয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করে অনুমোদন দেয়।
প্রশ্ন: প্রথম স্ত্রীর মতামত কি একেবারেই গুরুত্ব পায় না?
উত্তর: মতামত শোনা হতে পারে, তবে সিদ্ধান্ত তাদের হাতে নয়।
প্রশ্ন: ইসলামে কি দ্বিতীয় বিয়ে বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না। এটি অনুমোদিত, তবে ন্যায়বিচারের শর্তে।
উপসংহার
দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি— এই বক্তব্যটি অনেকের কাছে নতুন ও চমকপ্রদ হলেও এটি আসলে আইনের পুরোনো বিধানের একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা মাত্র।
হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছে, দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হবে আরবিট্রেশন কাউন্সিল, কোনো এক পক্ষের ব্যক্তিগত সম্মতি নয়।
এই রায় সামাজিকভাবে বিভিন্ন আলোচনা তৈরি করলেও আইনগতভাবে বিষয়টি এখন অনেক পরিষ্কার।
ভবিষ্যতে যারা দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাববেন, তাদের এই আইনি প্রক্রিয়া ভালোভাবে জেনে নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।