সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নিয়ে নতুন নির্দেশনা, মেয়াদ শেষের ৬ বছর পর হবে তামাদি

বাংলাদেশ ব্যাংক সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এখন মেয়াদপূর্তির পর আরও ৬ বছর পর্যন্ত মুনাফা দাবি করা যাবে। এরপর সরকারি ঋণ আইন,

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার তামাদি হিসাব (সরকারের দায় বিলুপ্ত হওয়ার সময়সীমা) নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা মেয়াদপূর্তির দিন পর্যন্ত বৈধ থাকবে। এরপর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ৬ বছর অতিক্রম করলে সরকারি ঋণ আইন, ২০২২-এর ধারা ৩৩ অনুযায়ী সেই মুনাফা তামাদি (Time-barred) হিসেবে গণ্য হবে।

মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে পাঠিয়েছে। সার্কুলারের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যাপত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে।

তামাদি (Time-barred) মানে কী?

তামাদি বলতে বোঝায়, কোনো অর্থ বা পাওনা দাবি করার জন্য আইনে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি না করলে পরে সেই অর্থ বা পাওনা আদায়ের আইনগত অধিকার আর থাকে না।

সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ৬ বছর পর্যন্ত বিনিয়োগকারী তার প্রাপ্য মুনাফা বা অর্থ দাবি করতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর নিয়ম অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করবে।

তবে মেয়াদপূর্তির পর ৬ বছর অতিক্রম করলে সেই মুনাফা বা পাওনা তামাদি হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ সরকারি ঋণ আইন, ২০২২ অনুযায়ী সরকারের সেই অর্থ পরিশোধের আইনগত বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না।

উদাহরণ

ধরুন, আপনার একটি সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১ জানুয়ারি ২০২৬। তাহলে ৩১ ডিসেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত আপনি সেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দাবি করতে পারবেন। কিন্তু ১ জানুয়ারি ২০৩২ থেকে ওই মুনাফা তামাদি হিসেবে গণ্য হবে এবং সাধারণ নিয়মে আর দাবি করা যাবে না।

সহজ ভাষায়: তামাদি মানে হলো, আইনে নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ায় কোনো অর্থ বা পাওনা দাবি করার অধিকার শেষ হয়ে যাওয়া।
Sanchaypotro

কী বলা হয়েছে নতুন নির্দেশনায়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রাপ্য সব ধরনের মুনাফা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো মুনাফা তামাদি হবে না।

তবে মেয়াদপূর্তির তারিখ থেকে যদি আরও ছয় বছর পার হয়ে যায় এবং এই সময়ের মধ্যে প্রাপ্য মুনাফা দাবি না করা হয়, তাহলে সেটি সরকারি ঋণ আইন অনুযায়ী তামাদি হিসেবে গণ্য হবে।

Related Posts

কোন কোন সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য?

নতুন ব্যাখ্যা অনুযায়ী নিচের সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম কার্যকর হবে—

  • পেনশনার সঞ্চয়পত্র
  • পরিবার সঞ্চয়পত্র
  • তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র
  • পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র
  • বছরভিত্তিক ভিন্ন মুনাফার হারযুক্ত সঞ্চয়পত্র

পেনশনার ও পরিবার সঞ্চয়পত্রে কী হবে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পেনশনার সঞ্চয়পত্র এবং পরিবার সঞ্চয়পত্রের মাসিক কুপন মুনাফা মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত প্রাপ্য হিসেবে বহাল থাকবে।

ফলে এসব সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ছয় বছর অতিবাহিত হলে তবেই সংশ্লিষ্ট মুনাফা তামাদি হিসেবে গণ্য হবে।

ত্রৈমাসিক ও পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রের নিয়ম

যেসব সঞ্চয়পত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা দেওয়া হয়, সেসব ত্রৈমাসিক মুনাফাও মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত বৈধ থাকবে।

একইভাবে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের নির্ধারিত মুনাফাও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত দাবি করা যাবে। এরপর মেয়াদপূর্তির পর ছয় বছর অতিক্রান্ত হলে তা তামাদি হিসেবে বিবেচিত হবে।

সরকারি ঋণ আইন ২০২২ কী বলছে?

সরকারি ঋণ আইন, ২০২২-এর ধারা ৩৩ অনুযায়ী, কোনো পাওনার জন্য আলাদা সময়সীমা নির্ধারিত না থাকলে দাবির তারিখ থেকে ছয় বছর পার হওয়ার পর সরকারের দায় তামাদি হয়ে যায়।

তবে সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে মুনাফার দাবি মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত বহাল থাকে। তাই এই ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তামাদির সময় গণনা শুরু হবে মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকে।

কেন এই ব্যাখ্যা দেওয়া হলো?

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তামাদি হওয়ার সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি পরিষ্কার করতে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর অর্থ বিভাগের কাছে ব্যাখ্যা চায়।

অর্থ বিভাগের মতামতের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এই নির্দেশনা জারি করেছে, যাতে সব তফসিলি ব্যাংক একই নিয়ম অনুসরণ করে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য এর গুরুত্ব

এই নির্দেশনার ফলে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীরা এখন স্পষ্টভাবে জানতে পারবেন যে, মেয়াদপূর্তির আগ পর্যন্ত তাদের মুনাফা নিরাপদ থাকবে এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আরও ছয় বছর পর্যন্ত সেই মুনাফা দাবি করার সুযোগ থাকবে।

এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর হবে এবং সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও আরও স্বচ্ছ ও সহজ হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে। এখন থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা মেয়াদপূর্তির তারিখ পর্যন্ত বৈধ থাকবে এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ছয় বছর পর্যন্ত দাবি করা যাবে। এরপর সরকারি ঋণ আইন, ২০২২ অনুযায়ী তা তামাদি হিসেবে গণ্য হবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রাপ্য মুনাফা দাবি করার সময়সীমা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাবেন।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.