বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, পাঁচ মাসে বিতরণ ১২ হাজার কোটি
ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে পাঁচ মাসে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতের জন্য গঠিত তহবিল থেকে ঋণ বিতরণে সাড়া কম। অন্যদিকে, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানসহ ছয়টি খাতের জন্য গঠিত কয়েকটি তহবিল থেকে এখনও কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। এ ছাড়া আরও ৯২৯ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
প্রণোদনা ঋণ বিতরণে ধীরগতি কেন?
ব্যাংকারদের মতে, বাংলাদেশে অর্থায়নের অভাবে ভালো কোনো কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা তুলনামূলক কম। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ পাচার, ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান না হওয়ায় বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় চালু করার জন্য ঋণ দিতে ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বন্ধ কারখানা সচল করতে নতুন অর্থায়নের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এসব সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় কম সুদের ঋণেও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
একজন ব্যাংকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করে অর্থ ছাড় করা হচ্ছে। তা না হলে বিতরণের পরিমাণ আরও কম হতে পারত বলে মনে করেন তিনি।
কবে ঘোষণা করা হয় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ?
চলতি বছরের ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ১৫টি খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংকগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণের বর্তমান গতি সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
কোন খাতে কত টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো তহবিলের পুরো অর্থ বিতরণ করা হলেও বেশ কয়েকটি খাতে বিতরণ এখনও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাত
বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাত সচল করার জন্য গঠিত ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ৫৬১ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। আরও ৯২৯ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ইউটিলিটি বিল এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে এই অর্থায়ন করা হবে।
ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সরকার সুদ ভর্তুকি দেবে।
সৃজনশীল অর্থনীতি ও প্রিশিপমেন্ট খাত
সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বরাদ্দ করা ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের পুরো অর্থ বিতরণ হয়েছে। তবে কোন খাতে বা প্রতিষ্ঠানে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
অন্যদিকে, প্রিশিপমেন্ট খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুরোনো পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। পণ্য জাহাজীকরণের আগে স্বল্প সময়ের জন্য অর্থায়ন করা হয়। ঋণ আদায়ের পর একই অর্থ পুনরায় বিতরণ করা সম্ভব হওয়ায় তহবিলের মূল আকারের চেয়ে মোট বিতরণের পরিমাণ বেশি হয়েছে।
কুটির, মাইক্রো ও সিএমএসএমই খাত
কুটির ও মাইক্রো খাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য গঠিত পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ স্কিম থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের (সিএমএসএমই) চলতি মূলধনের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে ৯০৮ কোটি টাকা।
কৃষি ও উত্তরবঙ্গের বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিল গঠন করা হয়েছে। তবে এ তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৯৩ কোটি টাকা।
উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য তিন হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৪৯ কোটি টাকা।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও স্টার্টআপ
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য গঠিত তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। এ ছাড়া স্টার্টআপ খাতের জন্য বরাদ্দ করা ৫০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে ৩৩ কোটি টাকা। আরও পাঁচ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ছয়টি তহবিল থেকে এখনও ঋণ বিতরণ হয়নি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সুদ ভর্তুকির আওতায় গঠিত ছয়টি প্রণোদনা তহবিল থেকে এখনও কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি। এর মধ্যে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতও রয়েছে।
বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান তহবিল
বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এক হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত এ তহবিল থেকে কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি। যদিও পুরো অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা
পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা স্থাপনের জন্য এক হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে ৫২৭ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় থাকলেও এখনও কোনো অর্থ ছাড় করা হয়নি।
চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি
চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানিতে অর্থায়নের জন্য গঠিত দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকেও এখনও কোনো অর্থ বিতরণ হয়নি। এ ক্ষেত্রে মাত্র ৯৮ কোটি টাকা বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য অর্জনে চ্যালেঞ্জ
ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো, বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ঋণ বিতরণের ধীরগতি, বন্ধ কারখানার কাঠামোগত সমস্যা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জনে শুধু কম সুদের ঋণ নয়, বরং কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং ব্যাংকঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনটি সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। প্রকাশের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল প্রতিবেদন থেকে তহবিলের অঙ্ক, বিতরণের পরিমাণ এবং ঘোষণার তারিখ যাচাই করে নিন।
