ছত্তার পাগলা কে? Taandob (তাণ্ডব) সিনেমায় ‘কে দিলো প্রীতের বেড়া’ গান ভাইরাল

বাউল ও চারণ কবি ছত্তার পাগলা কে ছিলেন? সম্প্রতি Taandob (তাণ্ডব) সিনেমায় তার গাওয়া ‘কে দিলো প্রীতের বেড়া / লিচুর বাগানে’ গানটি ব্যবহারের পর ভাইরাল হয়ে

ছত্তার পাগলা কে ছিলেন?

ছত্তার পাগলা নামেই পরিচিত ছত্তার তালুকদার ছিলেন একজন প্রথাগত বাউল ও চারণ কবি। তিনি জন্মগ্রহণ করেন আনুমানিক ১৯২৭ সালে নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার নুরুল্লাচর গ্রামে, যা পরে মোহনগঞ্জ-সংলগ্ন এলাকায় চলে যায়।

তাণ্ডব মুভিতে ভাইরাল ছত্তার পাগলার গান

ছত্তার পাগলার কালজয়ী গান "কে দিলো প্রীতের বেড়া / লিচুর বাগানে" সম্প্রতি আবারো আলোচনায় এসেছে, যখন এটি ব্যবহার করা হয়েছে নতুন বাংলা মুভি "তাণ্ডব"-এ। সিনেমাটিতে গানটির একটি সংক্ষিপ্ত অংশ চিত্রায়িত হয়, যা রিলিজের পরপরই ভাইরাল হয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। গানটির আবেগপ্রবণ সুর আর সহজ কথার মিশ্রণ দর্শকদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে।

এই গানের মধ্য দিয়ে ছত্তার পাগলার অনন্য সাংগীতিক ধারা নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরায় পরিচিত হয়েছে। সিনেমার এই গান ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ছত্তার পাগলার সৃষ্টিগুলো কেবল লোকগানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আজকের গণমাধ্যমেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

জীবন, গান ও পরিচয়

হাট, বাজার, রেলস্টেশন—প্রতিটি জনসমাগমের জায়গায় কাঠখড় পোড়ানো গানে ছত্তারের উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র। তিনি ‘পাগলা’ উপাধি পেয়েছিলেন, কারণ তার গান ও আয়ত্ত “পাগলদের মতো” লাগতো, এবং এটি এক ধরনের ভক্তিভাব ও একান্ততা প্রকাশ করে। গান লিখতেন মুখে কথায়, মানুষ তার গান শোনতেন, এবং লেখে রাখতেন অন্য অনুরাগীরা, যেমন আল মামুন চৌধুরী।

Taandob

জীবনের ধারা ও বৈশিষ্ট্য

তার গানে ছিল সমাজ, প্রেম, ভানিজ্য ও জায়গার সত্যের বাস্তবতা। বাজাতেন প্রাকৃতিক সুরের যন্ত্র, যেমন খঞ্জরী, ডুগডুগি, খোঁপড়ি বাঁশি। 'লেটো', 'জারি', 'পালাগীতি'—এগুলোর মধ্য দিয়েই তার প্রতিভার বিকাশ।

মৃত্যু ও বয়ঃসন্ধিক্ষণ

ছত্তার পাগলা মারা যান ১৭ এপ্রিল ২০১৪ বিকেল ২টা ৫০ মিনিটে, বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের নুরুল্লাচর গ্রামে নিজের ঘরে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৭ বছর।

ছত্তার পাগলা: বাংলার লোকসঙ্গীতের বাউল পুরুষ

ছত্তার পাগলা বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের জগতে এক অনন্য নাম। তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছে বহু প্রাচীন ও নিজস্ব লেখা গান, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রেম, সমাজ, ট্রেন যাত্রা এবং বাস্তব জীবনের গল্প।

কে দিলো প্রীতের বেড়া: ভাইরাল ট্রেনের গান

"কে দিলো প্রীতের বেড়া" গানটি ছত্তার পাগলার কণ্ঠে এক ট্রেন যাত্রার সময় রেকর্ড করা হয়, যা অল্প সময়েই ভাইরাল হয়ে পড়ে। গানটির মধ্যে রয়েছে গভীর প্রেম ও বিচ্ছেদের কথা, যা মানুষের হৃদয়ে সহজেই জায়গা করে নেয়।

ছত্তার পাগলার জনপ্রিয় গানসমূহ

  1. কে দিলো প্রীতের বেড়া / লিচুর বাগানে
  2. তওবা কইরা বল খেলাডা ছাড়
  3. কাঙ্গাল মাইরা জাঙ্গাল দিলে গুনাহ হইবো তোর
  4. ইঞ্জিন ছাড়া ঠেলাইয়া নেই খালি মালগাড়ি
  5. রসে ভরা ফল খাইলে হবে বল
  6. শাপলা বানু
  7. কিশোরীলো ও কিশোরী

উল্লেখযোগ্য তথ্য এক নজরে

  1. জন্ম: ≈১৯২৭, নুরুল্লাচর, নেত্রকোনা
  2. পেশা: অক্ষরজ্ঞানহীন বাউল ও চারণ কবি
  3. পরিচিতি: লোকের মুখে মুখে গান, “পাগলা ছত্তার” উপাধি
  4. গান শৈলী: মাটি-ঘেঁষা ভাষা, খঞ্জরী ও বাঁশির সঙ্গে
  5. লিখন: মুখে রচিত, অনুরাগীদের মাধ্যমে রেকর্ড ও সংরক্ষণ
  6. মরণ: ১৭ এপ্রিল ২০১৪, বয়স ~৮৭ বছর

ছত্তার পাগলার গানের বৈশিষ্ট্য

তার গানগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। সহজ ভাষা, মাটি ঘেঁষা সুর এবং বাস্তবতার মিশ্রণে প্রতিটি গান হয়ে ওঠে হৃদয়গ্রাহী।

উপসংহার

ছত্তার পাগলা বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে এক অদম্য বাউল-চারণ সংস্কারের ধর্মযাত্রী। চিন্তা ও ভাষার সরলতা, অক্ষরহীনতার মধ্যেও শিল্পপ্রতিভা—এসব গুণই তাকে পৃথক দাঁড় করিয়েছে। স্বভাব ও সুরের মিলন দেশজুড়ে অমর।

ছত্তার পাগলা শুধুমাত্র একজন লোকশিল্পী নন, তিনি এক জীবন্ত সংস্কৃতি। তাঁর গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে, যা বাংলা গানের ঐতিহ্যকে ধরে রাখছে।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.