সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা মারা গেলে কী হবে — নমিনি কিভাবে টাকা উত্তোলন করবেন
সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা মারা গেলে অনেকেই প্রশ্ন করেন—টাকা কে পাবে, মুনাফা কীভাবে পাবেন এবং উত্তোলন করার প্রক্রিয়া কী। সহজ উত্তর হলো: ক্রেতার নিবন্ধিত নমিনি সম্পূর্ণ সঞ্চয়পত্রের টাকা ও নিয়মিত মুনাফা উত্তোলন করার অধিকারী হন। নিচে ধাপে ধাপে বিস্তারিত প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় নথি দেওয়া হল।
নমিনি কীভাবে টাকা উত্তোলন করবেন — সার্বিক প্রক্রিয়া
নমিনি সঞ্চয়পত্র ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে আবেদন করবেন। শুধুমাত্র আবেদন করলেই হবে না—সাথে নির্ধারিত নথি জমা দিতে হবে। আবেদন পেলে কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে টাকা ও মুনাফা পরিশোধ করবে বা বিকল্প নির্দেশনা দেবে।
কী কাগজপত্র লাগবে
- ক্রেতার মৃত্যুসনদ: সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের স্থানীয় কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত মূল মৃত্যুসনদ জমা দিতে হবে।
- মেডিকেল মৃত্যুসনদ (যথাযথ ক্ষেত্রে): প্রয়োজনে হাসপাতাল/মেডিকেল কর্তৃপক্ষ থেকে প্রাপ্ত মৃত্যুসনদ দেখাতে হতে পারে।
- নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কপিঃ নমিনির NID-এর স্পষ্ট ফটোকপি সংযুক্ত করতে হবে।
- নমিনির ছবি: সদ্যতোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি জমা দিতে হবে।
- নাগরিকত্ব সনদের কপি: প্রয়োজনে নমিনির নাগরিকত্ব সনদের কপি লাগতে পারে।
- স্বাক্ষর সত্যায়ন কপি: নমিনির স্বাক্ষর সত্যায়িত কাগজপত্র (উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর/মোমেন্টো)।
- ব্যাংক হিসাবের MICR চেক পাতা কপি: নমিনির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমানোর জন্য এমআইসিআর চেক পাতা/ব্যান্ক অ্যাকাউন্ট প্রমাণ দাখিল করতে হবে।
Related Posts
মৃত্যুর পর সঞ্চয়পত্র চালু রাখা যাবে কি?
হ্যাঁ। যদি নমিনি পুরো টাকা না তুলে সঞ্চয়পত্রটিকে চালু রাখতে চান, তবে নমিনি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র চালু রাখতে পারবেন। মেয়াদ শেষ হলে মূল নগদায়ন করে নমিনি নিজ নামে পুনরায় সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে নিতে পারেন এবং সেই ক্রয়ের মাধ্যমে নতুন নমিনি নিয়োগ করা যাবে।
নতুন নমিনি নিযুক্ত করা যাবে কি?
সোজাসাপটা ক্ষেত্রে—ক্রেতার মৃত্যু হলেও নমিনি কোন নতুন নমিনি সরাসরি নিযুক্ত করতে পারবে না। কর্মপ্রবাহ হলো: নমিনি মূল টাকা উত্তোলন করে নগদায়িত করলে নিজ নামে নতুন সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে সেখানে তিনি ইচ্ছেমতো নতুন নমিনি নিযুক্ত করতে পারবেন। সরাসরি পুরনো সঞ্চয়পত্রে নমিনির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ক্রেতা ও নমিনি উভয়ই মারা গেলে কী করতে হবে?
এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। আদালত কর্তৃক নির্ধারিত ক্রেতার উত্তরাধিকারীরা সঞ্চয়পত্রের মালিকানা লাভ করবেন। তাই উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি কাগজপত্র ও আদালতের আদেশ জোরালো প্রমাণ হিসেবে লাগবে।
কত ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে এবং লাভের হার
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে প্রধান চার ধরনের সঞ্চয়পত্র প্রচলিত—
- পরিবার সঞ্চয়পত্র
- পেনশনার সঞ্চয়পত্র
- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র
- তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র
পরিবার সঞ্চয়পত্র ছাড়া বাকি সব সঞ্চয়পত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়েই বিনিয়োগ করতে পারেন। প্রতিটি সঞ্চয়পত্রের মেয়াদপূর্তির মুনাফা হার আলাদা—সাধারণত ১১.৯৮% থেকে ১১.৭০% পর্যন্ত ভ্যারিয়েশন থাকে (নির্ধারিত সময় ও নীতিমালার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে)।
মেয়াদপূর্তির আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙলে কী হবে?
মেয়াদপূর্তির আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙলে মুনাফা হ্রাস পায়। এজন্য জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র ভাঙার পরামর্শ দেওয়া হয় না। মেয়াদপূর্তির আগে উত্তোলন করলে মুনাফা গণনা সীমিত নিয়মে হবে—অতএব আগে থেকে শর্তগুলো যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিন।
একক ও যৌথ সঞ্চয়পত্র
সঞ্চয়পত্র একক নামেও কেনা যায় এবং যৌথ নামেও কেনা যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠান পর্যায়েও কিছু সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
সঞ্চয়পত্র কেন নিরাপদ বিনিয়োগ?
সঞ্চয়পত্রকে সাধারণত সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ পদ্ধতি মনে করা হয়। সুদের হারও তুলনামূলকভাবে ভাল এবং মধ্যবিত্ত শ্রেনীর জন্য এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঞ্চয় উপায়। বহু মানুষ এই স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তার জন্য সঞ্চয়পত্র বেছে নেন।
উপসংহার
সংক্ষেপে, কোনো সঞ্চয়পত্র ক্রেতা মারা গেলে নমিনি সম্পূর্ণ টাকা ও মুনাফা উত্তোলনের অধিকারী। আবেদন করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যুসনদ, নমিনির NID, ছবি, ব্যাংক তথ্যসহ নির্ধারিত কাগজপত্র জমা দিতে হবে। ক্রেতা ও নমিনি উভয়ই না থাকলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী উত্তরাধিকারীরা মালিকানা পেতে পারেন। সঞ্চয়পত্র সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা ও শর্তাবলি যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে কোনো জটিলতা ছাড়াই উত্তরাধিকারী বা নমিনি তহবিল গ্রহণ করতে পারবেন।