আয়কর রিটার্নে ১০টি করযোগ্য আয়ের খাত (রিটার্ন গাইড)
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় অনেক করদাতাই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হন— কোন কোন খাতের আয় দেখাতে হবে এবং কীভাবে দেখাতে হবে তা নিয়ে।
বাস্তবে আয়কর আইন অনুযায়ী আপনাকে সব খাত থেকে আয় থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যে খাত থেকেই আয় হোক না কেন, সেটি সঠিক খাতে দেখানো বাধ্যতামূলক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আয়কর রিটার্ন ফরমে একজন করদাতার মোট আয়কে ১০টি নির্দিষ্ট আয়ের খাতে ভাগ করে দিয়েছে। আইটি-১১গ (২০২৩) ফরম অনুসরণ করে করদাতা সহজেই নিজের খাতভিত্তিক আয় ও মোট আয় নির্ধারণ করতে পারেন।
দুই দফা সময় বাড়ানোর পর ৩১ জানুয়ারি চলতি বছরের আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময়। এবার সব করদাতাকেই অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে, তবে আয় সংক্রান্ত কাগজপত্র আপলোড করা বাধ্যতামূলক নয়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক— আয়কর রিটার্নে ব্যবহৃত সেই ১০টি করযোগ্য আয়ের খাত কী কী।
আয়কর রিটার্নের ১০টি করযোগ্য আয়ের খাত
১. চাকরির বেতন–ভাতা
সরকারি, আধা-সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি থেকে পাওয়া—
- মূল বেতন
- বিভিন্ন ভাতা
- বোনাস
- ইনসেনটিভ
- অন্যান্য সুবিধা
সবকিছুই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত হবে।
২. ভাড়া আয়
বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান বা যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে যে আয় হয়, তা এই খাতে দেখাতে হবে।
👉 রিটার্নে পুরো বছরের মোট ভাড়া আয় একসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়।
আরও পড়ুন
৩. কৃষি খাতের আয়
বাণিজ্যিক কৃষি বা ব্যক্তিগত কৃষিকাজ থেকে অর্জিত আয় যেমন—
- ফসল উৎপাদন
- ফল ও সবজি চাষ
- পশুপালন
- মাছ চাষ
এসব আয়ের তথ্য এই খাতে দেখাতে হবে।
৪. ব্যবসায় ও পেশাগত আয়
ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা থেকে আয় ছাড়াও—
- চিকিৎসক
- আইনজীবী
- পরামর্শক
- ফ্রিল্যান্সার
এই ধরনের পেশাজীবীদের উপার্জনও ব্যবসায় আয়ের অন্তর্ভুক্ত।
৫. বিদেশ থেকে অর্জিত আয়
বিদেশে চাকরি, কনসালটেন্সি বা যেকোনো সেবা থেকে আয় হলে তা রিটার্নে দেখাতে হবে।
এছাড়া বিদেশে থাকা—
- বিনিয়োগ
- সম্পত্তি
- ব্যাংক সুদ
যদি করযোগ্য হয়, সেটিও এই খাতে অন্তর্ভুক্ত হবে।
৬. মূলধনি আয়
মূলধনি সম্পদ থেকে অর্জিত আয় যেমন—
- মুনাফা
- রয়্যালটি
- ভাড়া
- সুদ
এসব আয় এই খাতে দেখানো হয়।
৭. সুদ ও লভ্যাংশ
নিম্নোক্ত উৎস থেকে আয় হলে তা আলাদা করে উল্লেখ করতে হয়—
- ব্যাংক আমানতের সুদ
- সঞ্চয়পত্রের মুনাফা
- শেয়ার লভ্যাংশ
- ট্রেজারি বন্ড ও সরকারি সিকিউরিটিজ
৮. ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘের আয়
যারা পার্টনারশিপ ব্যবসা বা ব্যক্তিসংঘের সদস্য, তারা বছরে যে আয় পান, সেটি এই খাতে দেখাতে হয়।
৯. স্ত্রী/স্বামী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আয়
পরিবারের কোনো সদস্য করদাতা না হলে এবং তাঁদের আয় করদাতার সঙ্গে যোগ হয়—
👉 তাহলে সেই আয় এই খাতে দেখাতে হবে।
১০. অন্যান্য উৎসের আয়
যেসব আয় আলাদা কোনো নির্দিষ্ট খাতে পড়ে না, যেমন—
- রয়্যালটি
- লাইসেন্স ফি
- সম্মানী
- সরকারি নগদ ভর্তুকি
- বিচ্ছিন্ন বা অনিয়মিত আয়
এসব “অন্যান্য উৎসের আয়” হিসেবে দেখাতে হয়।
প্রশ্ন–উত্তর (FAQ)
আয়কর রিটার্নে কি সব ১০টি আয়ের খাত পূরণ করা বাধ্যতামূলক?
না। যেসব খাত থেকে আপনার আয় হয়েছে, শুধু সেসব খাতেই আয় দেখাতে হবে। সব ১০টি খাত পূরণ করা বাধ্যতামূলক নয়।
একই আয় কি একাধিক খাতে দেখানো যাবে?
না। একটি আয় অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সঠিক খাতেই দেখাতে হবে। একই আয় একাধিক খাতে দেখালে কর নিরীক্ষা বা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স আয় থাকলে কোন খাতে দেখাবো?
চাকরির আয় “চাকরির বেতন–ভাতা” খাতে এবং ফ্রিল্যান্স বা কনসালটেন্সি আয় “ব্যবসায় ও পেশাগত আয়” খাতে আলাদাভাবে দেখাতে হবে।
বিদেশ থেকে অর্জিত আয় কি আয়কর রিটার্নে দেখাতে হয়?
হ্যাঁ। বিদেশে চাকরি বা সেবা থেকে আয় হলে এবং তা করযোগ্য হলে অবশ্যই নির্ধারিত খাতে রিটার্নে দেখাতে হয়।
অনলাইনে রিটার্ন দিলে কি আয়ের কাগজপত্র আপলোড করতে হয়?
না। বর্তমানে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার সময় আয়ের কাগজপত্র আপলোড করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভবিষ্যতে যাচাইয়ের জন্য কাগজপত্র সংরক্ষণ করা উচিত।
ভুল খাতে আয় দেখালে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
ভুল খাতে আয় দেখালে কর নিরীক্ষা, অতিরিক্ত কর দাবি অথবা আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সঠিক খাত নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
আয়কর রিটার্ন সঠিকভাবে জমা দেওয়ার জন্য খাতভিত্তিক আয় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত ১০টি আয়ের খাত বুঝে রিটার্ন পূরণ করলে কর ঝুঁকি যেমন কমে, তেমনি ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারি বা আর্থিক সেবায় সমস্যা হয় না।
তাই রিটার্ন দেওয়ার আগে নিজের আয়ের উৎসগুলো ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।