ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীর ঝাঁকুনি দেয় কেন? হিপনিক জার্কস সম্পর্কে জানুন
সবে চোখটা বুজে এসেছে, ঠিক তখনই হঠাৎ একটা ঝটকা। মনে হয় যেন কোথাও থেকে পড়ে যাচ্ছেন, আর সেই সঙ্গে শরীরটা প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। অনেকেই এই অভিজ্ঞতায় ভয় পেয়ে যান।
তবে জেনে রাখুন, এটা কোনো বিরল সমস্যা নয়। গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘুমের মধ্যে এমন শরীরের ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
আরও পড়ুন
ঘুমের মধ্যে শরীর ঝাঁকুনি দেওয়াকে কী বলা হয়?
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ এই ধরনের ঝাঁকুনিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হিপনিক জার্কস’ (Hypnic Jerks) বা Sleep Starts বলা হয়।
এটি সাধারণত ঘটে জেগে থাকা অবস্থা থেকে ঘুমে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে। এই সময় মানুষ পুরোপুরি ঘুমিয়েও পড়ে না, আবার পুরোপুরি জেগেও থাকে না।
কেন হিপনিক জার্কস হয়?
এই পর্যায়কে বলা যায় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা। এই সময়েই অনেকের হালকা স্বপ্ন দেখা শুরু হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই অবস্থায় মস্তিষ্ক জাগরণ ও স্বপ্নের সীমা ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না। ফলে মস্তিষ্ক মনে করে, শরীর হয়তো হঠাৎ পড়ে যাচ্ছে বা ভারসাম্য হারাচ্ছে।
এই ভুল সংকেত থেকেই মস্তিষ্ক শরীরে দ্রুত একটি প্রতিক্রিয়া পাঠায়, আর তার ফলেই হঠাৎ ঝাঁকুনি বা ধাক্কা অনুভূত হয়। এটিই হিপনিক জার্কস।
মস্তিষ্ক কেন শরীরের অবস্থা বুঝতে পারে না?
ঘুম ঘনিয়ে এলে শরীরের মাংসপেশি ও মাসলগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে। এটি ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
কিন্তু অনেক সময় মস্তিষ্ক এই পেশী শিথিল হওয়ার বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে। সে মনে করে, শরীর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া থামানোর চেষ্টা করতেই মস্তিষ্ক হঠাৎ করে স্নায়ুর মাধ্যমে সংকেত পাঠায়, যার ফলে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।
কোন কোন কারণে হিপনিক জার্কস বেশি হতে পারে?
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা
- ক্যাফেইন (চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক) বেশি গ্রহণ
- অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শারীরিক অবসাদ
- রাতে বেশি মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার
নাক ডাকার সঙ্গে কি এর সম্পর্ক আছে?
চিকিৎসকদের মতে, অনেক সময় নাক ডাকা বা শ্বাসপ্রশ্বাসে সাময়িক বাধা পেলেও হিপনিক জার্কস হতে পারে।
এই ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্র হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং শরীরকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে, ফলে ঝাঁকুনি দেখা দেয়।
এতে কি ভয় পাওয়ার কিছু আছে?
না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিপনিক জার্কস সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং ক্ষতিকর নয়।
চিকিৎসকদের মতে, যদি এটি খুব ঘনঘন না ঘটে এবং দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা সৃষ্টি না করে, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই।
কীভাবে হিপনিক জার্কস কমানো যায়?
- নিয়মিত ঘুমানোর সময় ঠিক করা
- রাতে চা-কফি এড়িয়ে চলা
- ঘুমানোর আগে মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহার কমানো
- মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা
- ঘুমের আগে হালকা স্ট্রেচিং বা শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম করা
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীর ঝাঁকুনি দেওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। এটি সাধারণত হিপনিক জার্কসের কারণে হয়ে থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর নয়।
তবে যদি এই সমস্যা অতিরিক্ত বেড়ে যায়, ঘুমে বারবার ব্যাঘাত ঘটে অথবা দিনের বেলায় ক্লান্তি অনুভূত হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।