বর্তমানে বাংলাদেশে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়াই কঠিন, যে পরিবারে কোনো ডায়াবেটিস রোগী নেই। তাই নিজের ও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই রোগ সম্পর্কে কিছু সাধারণ জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মূলত ডায়াবেটিসের দুটি প্রধান ধরন দেখা যায়— টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস। নাম কাছাকাছি হলেও, এই দুই ধরনের ডায়াবেটিসের কারণ, শুরু হওয়ার বয়স, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং জীবনযাপনে প্রভাব এক নয়। নাম হয়তো আগে শুনেছেন, কিন্তু বিস্তারিত জানা হয়নি। চলুন আজ বিষয়টি সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস
টাইপ ১ ডায়াবেটিস সাধারণত শৈশব বা কৈশোর বয়সে ধরা পড়ে। এই ধরনের ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো ধ্বংস করে ফেলে।
ফলে শরীর একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। ইনসুলিন ছাড়া রক্তের শর্করা কোষে প্রবেশ করতে পারে না, যার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আজীবন ইনসুলিন নিতে হয়। এক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাপনের চেয়ে জেনেটিক ও অটোইমিউন কারণ বেশি ভূমিকা রাখে।
আরও পড়ুন
টাইপ ২ ডায়াবেটিস
টাইপ ২ ডায়াবেটিস সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, যদিও বর্তমানে কম বয়সীদের মধ্যেও এর হার বাড়ছে।
এই ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিন তৈরি করে, কিন্তু সেই ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না বা প্রয়োজনের তুলনায় কম তৈরি হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন, অনিয়মিত জীবনযাপন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং পারিবারিক ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
শুরুর দিকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম এবং মুখে খাওয়ার ওষুধেই অনেক সময় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ইনসুলিনও প্রয়োজন হতে পারে।
টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ
লক্ষণগত দিক থেকেও টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসের লক্ষণ
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত পিপাসা
- ঘন ঘন প্রস্রাব
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
এই লক্ষণগুলো সাধারণত খুব দ্রুত প্রকাশ পায়।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে লক্ষণ অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ না থাকায় রোগটি নীরবে শরীরে থেকে যায়।
চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পার্থক্য
চিকিৎসা ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ব্যবস্থাপনা আলাদা।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে জীবনযাপনে পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অনেক ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতি ধীর করতে পারে।
সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণই মূল চাবিকাঠি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— টাইপ ১ বা টাইপ ২, যেকোনো ডায়াবেটিসই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং সচেতন জীবনযাপন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
- American Diabetes Association
- National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases