টেলিযোগাযোগ নীতিমালা ২০২৫ সংশোধনে যাচ্ছে সরকার: বিতর্কের পর বড় সিদ্ধান্ত
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বহুল আলোচিত ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০২৫’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অংশীজনদের আপত্তি, দেশি উদ্যোক্তাদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করা হলে খাতে ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি ক্লাস্টার গঠন করে নীতিমালাটি পর্যালোচনা করছে।
তিনি আরও জানান, সংশোধন কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিতর্কের মূল কারণ
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রণীত এই নীতিমালায় টেলিকম খাতের লাইসেন্সিং কাঠামো তিন স্তরে নামিয়ে আনা হয়। তবে শুরু থেকেই এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো—নীতিমালাটি বড় কোম্পানি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী, ৬৫% বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেলিকম খাতের সব স্তরে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে মোবাইল অপারেটররা টাওয়ার, ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক পর্যায়ের সেবা—সব ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারবে। তবে একই সুযোগ দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য রাখা হয়নি, যা নিয়ে সমালোচনা তীব্র হয়েছে।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ
টাওয়ার ও এনটিটিএন লাইসেন্সধারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাবমেরিন ক্যাবলসহ আন্তর্জাতিক পরিষেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ায় তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় কোম্পানির সঙ্গে টিকে থাকতে সমস্যায় পড়বেন।
বাজারে আধিপত্যের আশঙ্কা
বর্তমানে দেশের টেলিকম খাতের প্রায় ৮০% রাজস্ব মোবাইল অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অপারেটররা অবকাঠামো খাতেও প্রবেশ করে, তাহলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সংকটে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও সংগঠনের মতামত
সুমন আহমেদ সাবির এবং আরিফ আল ইসলাম মনে করেন, অবকাঠামো খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হলে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
আইএসপিএবি’র সভাপতি আমিনুল হক বলেন, মোবাইল অপারেটরদের বাসাবাড়িতে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে সাধারণ ISP-দের জন্য এটি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
নীতিমালাটি রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এতে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই এবং বড় কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে।
Related Posts
মোবাইল অপারেটরদের অবস্থান
অন্যদিকে মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো নীতিমালা পরিবর্তনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সমস্যাযুক্ত ধারাগুলো দ্রুত সংশোধন করাই বেশি কার্যকর হবে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, সরকার যদি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নীতিমালাটি সংশোধন করতে পারে, তাহলে টেলিকম খাতে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে।
এই সংশোধন উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগের পথও খুলে দিতে পারে।