বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ছে ২০২৬ | কত বাড়বে ও কারা প্রভাবিত হবে

বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ানোর প্রস্তাব ২০২৬। ইউনিটপ্রতি কত বাড়বে, কারা বেশি প্রভাবিত হবে এবং এর প্রভাব কী—জানুন বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
bangladesh-electricity-price-increase

দেশে আবারও বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম: কী প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর?

দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর কাছে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া এই প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে খুচরা পর্যায়ে ব্যবহারভিত্তিক বিভিন্ন স্ল্যাবে মূল্য সমন্বয় করা হবে। তবে স্বল্প ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের আপাতত এই বাড়তি চাপের বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)সহ বিভিন্ন বিতরণ সংস্থা প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিইআরসি জানিয়েছে, প্রস্তাব পাওয়ার পর তা আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করে গণশুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রস্তাব যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা হবে। অন্যদিকে পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, তারা প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ করছেন। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী জুনের শুরুতেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কেন বাড়ছে বিদ্যুতের দাম?

বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান এবং ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতেই এই মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারকে ক্রমাগত বাড়তি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

কারা বেশি প্রভাবিত হবেন?

প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি প্রায় ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে। আবার ৭৬ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৭০ পয়সা। তবে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের আপাতত এই বাড়তি খরচ থেকে মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহক সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় পড়তে পারেন। বাকি ৬৩ শতাংশ স্বল্প ব্যবহারকারী তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে পণ্য উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

ভর্তুকির চাপ ও সরকারের চ্যালেঞ্জ

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই ঘাটতির কারণে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সরকার ইতোমধ্যে এই খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ কমানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জের প্রভাব

বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ও একটি বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এতে করে সামগ্রিক ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ইতিহাস

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতি ইউনিটের গড় খুচরা মূল্য ছিল ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি মূল্য ছিল ৭ টাকা ৪ পয়সা। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এই হার আরও বাড়বে।

কী সিদ্ধান্ত আসতে পারে?

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমতে পারে, তবে এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও বাজারমূল্যে। এখন বিইআরসির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত মূল্য কতটা বাড়বে এবং কবে থেকে তা কার্যকর হবে।

সূত্র: বিদ্যুৎ বিভাগ, বিইআরসি, পিডিবি ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষণ।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.