দেশে প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এলাকাভেদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর বার্ষিক অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শহর, পৌরসভা ও গ্রামাঞ্চলভেদে ভিন্ন হারে কর দিতে হতে পারে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলা ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। তবে অধিকাংশ অটোরিকশার কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন না থাকায় সঠিক পরিসংখ্যান ও নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ কারণেই সরকার নতুন নীতিমালা ও কর কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
অটোরিকশার নতুন কর ২০২৬
প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, এলাকাভেদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হতে পারে।
রাজধানী ও বড় সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
পৌরসভা ও জেলা শহরে এই কর ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। অন্যদিকে ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
| এলাকা | সম্ভাব্য বার্ষিক কর |
|---|---|
| সিটি কর্পোরেশন এলাকা | সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা |
| পৌরসভা ও জেলা শহর | ২,০০০ - ৩,০০০ টাকা |
| ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চল | সর্বনিম্ন ১,০০০ টাকা |
কিভাবে নির্ধারিত হবে এই কর?
সরকার মূলত এলাকার ধরন, যানবাহনের ব্যবহার এবং নিবন্ধনের ভিত্তিতে এই কর নির্ধারণ করতে চায়।
সিটি কর্পোরেশন এলাকায় যেহেতু অটোরিকশার ব্যবহার বেশি এবং আয়ও তুলনামূলক বেশি হয়, তাই সেখানে করের পরিমাণও বেশি রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের ব্যবহার, আয় এবং এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই কর কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এতে শহরাঞ্চলে বেশি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত অটোরিকশাগুলো থেকে বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
নিবন্ধন ও ফিটনেস বাধ্যতামূলক হতে পারে
সরকার শুধু কর আরোপেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে।
বর্তমানে অধিকাংশ অটোরিকশার বৈধ রেজিস্ট্রেশন নেই। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে প্রতিটি অটোরিকশার জন্য রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেস নবায়ন এবং ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক হতে পারে।
এতে সড়ক নিরাপত্তা, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা কমাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’
প্রস্তাবিত ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী প্রতিটি অটোরিকশাকে একটি নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
এর ফলে সরকার সহজেই কর আদায় ও যানবাহন মনিটরিং করতে পারবে। একই সঙ্গে সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলও কমানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন সরকার এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?
বর্তমানে দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই এই যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে এসব যানবাহন অনুমোদন ছাড়াই চলাচল করছে, ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
সরকারের মতে, কর এবং নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই খাতকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
খাতসংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
অটোরিকশা মালিক ও চালকদের অনেকেই বলছেন, হঠাৎ অতিরিক্ত কর আরোপ করলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের চালকদের আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় কর নির্ধারণে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে অনেকেই মনে করছেন, যদি সহজ নিবন্ধন এবং কিস্তিভিত্তিক কর পরিশোধ সুবিধা রাখা হয়, তাহলে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।
রাজস্ব আয় ও সম্ভাবনা
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক যানবাহন করের আওতায় এলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা গেলে এই খাতকে আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
চ্যালেঞ্জ কোথায়?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অনিবন্ধিত অটোরিকশাগুলোকে তালিকাভুক্ত করা এবং নিয়মিত কর আদায় নিশ্চিত করা।
এছাড়া গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ কর আরোপ করলে চালক ও মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন
উপসংহার
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ দেশের পরিবহন খাতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর মাধ্যমে সরকার যেমন রাজস্ব আয় বাড়াতে চায়, তেমনি দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা খাতকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনতে চায়।
তবে এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে নিবন্ধন ব্যবস্থা সহজ করা, চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবসম্মত কর কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।