টানা ৮ ঘণ্টার বেশি গণপরিবহন চালালেই লাইসেন্স বাতিল? নতুন নির্দেশনা BRTA’র

brta-driver-working-hours-rule

এখন থেকে টানা ৮ ঘণ্টার বেশি গণপরিবহন চালালেই লাইসেন্স বাতিল?

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গণপরিবহন চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ে নতুন করে কঠোর অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। দীর্ঘসময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে উল্লেখ করে চালকদের জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।

একই সঙ্গে এই নির্দেশনা অমান্য করলে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন বাতিলেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর নতুন নির্দেশনা কী?

শনিবার (২৩ মে) বিআরটিএ সদর কার্যালয় থেকে জারি করা এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সময় একটানা গাড়ি চালানোর কারণে চালকদের মধ্যে ক্লান্তি, অবসাদ, ঝিমুনি ও ঘুমের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং চালক, হেলপার, যাত্রী ও পথচারীদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।

এই কারণেই এখন থেকে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে বিআরটিএ।

একজন চালক কতক্ষণ গাড়ি চালাতে পারবেন?

বিআরটিএ জানিয়েছে, দেশের বিদ্যমান মোটরযান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী কোনো চালক একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না।

পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর তাকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে। এরপর আরও সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে।

অর্থাৎ একজন গণপরিবহন চালক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

কেন আনা হলো এই নিয়ম?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ চালকের ক্লান্তি ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা।

দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের অনেক চালক পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান। এতে তাদের মনোযোগ কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

বিআরটিএ বলছে, নির্ধারিত সময়ের বেশি গাড়ি চালালে চালকদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা কমে যায়। ফলে সামান্য ভুল থেকেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

নিয়ম না মানলে কী শাস্তি?

বিআরটিএর সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে।

শুধু চালক নয়, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের রেজিস্ট্রেশনও বাতিলের আওতায় আসতে পারে।

এছাড়া পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যদি তারা চালকদের অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাতে বাধ্য করেন।

যেসব কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে

  • টানা দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো
  • পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব
  • চালকের ঘুম ঘুম ভাব
  • অতিরিক্ত গতি
  • চাপের মধ্যে অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়া

ঈদের সময় ঝুঁকি আরও বাড়ে

পরিবহন খাত বিশ্লেষকদের মতে, ঈদ বা বড় ছুটির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।

তখন অনেক চালক টানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালান। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।

বিআরটিএর নতুন নির্দেশনা সেই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিয়ম সীমা
একটানা গাড়ি চালানো সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা
বাধ্যতামূলক বিশ্রাম কমপক্ষে ৩০ মিনিট
দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা
সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ৪৮ ঘণ্টা
নিয়ম ভাঙলে লাইসেন্স/রেজিস্ট্রেশন বাতিল হতে পারে

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, শুধু আইন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি।

মহাসড়কে পর্যাপ্ত বিশ্রাম কেন্দ্র, ড্রাইভার চেঞ্জিং পয়েন্ট এবং আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে দুর্ঘটনা আরও কমানো সম্ভব হবে।

চালকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পরিবহন মালিকদের জন্যও সতর্কবার্তা

বিআরটিএ জানিয়েছে, অতিরিক্ত ট্রিপ বা আর্থিক লাভের আশায় অনেক সময় মালিকপক্ষ চালকদের বেশি সময় গাড়ি চালাতে চাপ দেয়।

এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিক, চালক এবং যাত্রী—সব পক্ষের সচেতনতা জরুরি।

সড়ক দুর্ঘটনা কেন উদ্বেগের বিষয়?

বর্তমানে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন।

এর বড় একটি অংশ ঘটে ক্লান্ত চালক, অতিরিক্ত গতি এবং বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের কারণে।

আরও পড়ুন

চালকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, চালকদের নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ যাত্রার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মানসিক চাপ কম রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে যাত্রীদেরও অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য চাপ না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উপসংহার

গণপরিবহন চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ে বিআরটিএর নতুন কঠোর অবস্থান দেশের সড়ক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টানা দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো বন্ধ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এখন দেখার বিষয়, এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

একজন চালক একটানা কত ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারবেন?

একটানা সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে।

৫ ঘণ্টা চালানোর পর কতক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে?

কমপক্ষে ৩০ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে।

দৈনিক সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে?

দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে।

নিয়ম ভাঙলে কী হতে পারে?

চালকের লাইসেন্স এবং যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হতে পারে।

এই নির্দেশনা কে দিয়েছে?

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.