ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬: NBR-এর নতুন নিয়মে কার কত ভ্যাট দিতে হবে?

ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬ নিয়ে NBR-এর নতুন নির্দেশনা জানুন। অনলাইন বিক্রেতা, Facebook Seller, Daraz ও Chaldal-এর ভ্যাট হার, কমিশন ভ্যাট
ecommerce-marketplace-vat-2026-bangladesh-nbr-rules

বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ৭ জুন ২০২৬ তারিখে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ আদেশ জারি করেছে, যেখানে ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬ সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

এই নতুন আদেশ অনুযায়ী অনলাইনে পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠান, ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা, নিজস্ব ই-কমার্স ওয়েবসাইট এবং Daraz, Chaldal-এর মতো মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

আপনি যদি অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেন অথবা একটি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস পরিচালনা করেন, তাহলে এই নতুন নিয়ম আপনার ব্যবসার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের নতুন ভ্যাট নিয়ম ২০২৬

NBR-এর সাধারণ আদেশ নং-০৫/মূসক/২০২৬ অনুযায়ী অনলাইন পণ্য বিক্রয় কার্যক্রমকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

  • অনলাইন খুচরা বিক্রেতা (Online Retailer)
  • মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী (Marketplace Operator)

এই দুই ধরনের ব্যবসার ভ্যাট হিসাব এবং পরিশোধের নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা। তাই প্রথমেই ব্যবসার ধরন সঠিকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি।

অনলাইন খুচরা বিক্রেতা কারা?

অনলাইন খুচরা বিক্রেতা হলো সেই প্রতিষ্ঠান যারা নিজে পণ্য ক্রয় করে এবং পরে নিজের ওয়েবসাইট, অ্যাপ অথবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে।

এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান নিজেই পণ্যের মালিক থাকে এবং সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রয় সম্পন্ন করে।

উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো অনলাইন শপ একটি ব্লেন্ডার প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে কিনে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিক্রি করে, তাহলে সেটি অনলাইন খুচরা বিক্রেতা হিসেবে গণ্য হবে।

অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের ভ্যাট কত?

নতুন নিয়ম অনুযায়ী অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ভ্যাটের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.৫%

তবে কোনো নিবন্ধিত ব্যবসা চাইলে স্বেচ্ছায় ১৫% হারে ভ্যাট পরিশোধও করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী পর্যায়ে পণ্যের ওপর ইতোমধ্যে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে একই পণ্যের ওপর পুনরায় পূর্ণ ভ্যাট আরোপ করা হবে না।

তবে সেই ক্ষেত্রে মূসক চালান বা ভ্যাট চালানের কপি সংরক্ষণ করতে হবে।

বাস্তব উদাহরণ

ধরুন, একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠান ৫,০০০ টাকায় একটি ব্লেন্ডার কিনেছে এবং ক্রয়ের সময় ভ্যাট ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।

এখন সেই ব্লেন্ডার যদি একই মূল্যে অনলাইনে বিক্রি করা হয়, তাহলে আবার সম্পূর্ণ পণ্যমূল্যের ওপর নতুন করে পূর্ণ ভ্যাট আরোপ করা হবে না।

শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ভ্যাট নথি সংরক্ষণ করলেই হবে।

মূসক-৪.৩ ফর্ম কি বাধ্যতামূলক?

না।

NBR স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ইনপুট-আউটপুট সহগ ঘোষণা (মূসক-৪.৩) দাখিল বাধ্যতামূলক নয়।

কারণ অনলাইন ব্যবসাগুলো সাধারণত হাজার হাজার পণ্য নিয়ে কাজ করে এবং প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা সহগ নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়।

মার্কেটপ্লেস কী?

মার্কেটপ্লেস হলো এমন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে বিভিন্ন বিক্রেতা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করেন।

মার্কেটপ্লেস নিজে পণ্যের মালিক নয়, বরং বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।

বাংলাদেশে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসের উদাহরণ:

  • Daraz
  • Chaldal
  • Pickaboo Marketplace
  • অন্যান্য Multi-vendor Platform

মার্কেটপ্লেসের ভ্যাট কীভাবে নির্ধারণ হবে?

নতুন নিয়ম অনুযায়ী মার্কেটপ্লেসকে পুরো পণ্যমূল্যের ওপর ভ্যাট দিতে হবে না।

তাদের শুধুমাত্র নিজেদের কমিশন বা সার্ভিস চার্জের ওপর ১৫% হারে ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে।

এটি মার্কেটপ্লেস ব্যবসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বিষয়।

মার্কেটপ্লেস ভ্যাটের উদাহরণ

ধরুন একজন বিক্রেতা Daraz-এর মাধ্যমে ১০,০০০ টাকার একটি জুতা বিক্রি করলেন।

Daraz কমিশন হিসেবে ৫% নিল।

অর্থাৎ কমিশন = ৫০০ টাকা।

এখন Daraz-কে ভ্যাট দিতে হবে:

৫০০ টাকার ১৫% = ৭৫ টাকা

অর্থাৎ ১০,০০০ টাকার পুরো বিক্রয়মূল্যের ওপর নয়, শুধুমাত্র কমিশনের ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য হবে।

ভ্যাটমুক্ত পণ্য বিক্রিতেও কি ভ্যাট দিতে হবে?

অনেকেই মনে করেন যদি পণ্য ভ্যাটমুক্ত হয়, তাহলে পুরো লেনদেনও ভ্যাটমুক্ত হবে।

কিন্তু নতুন নিয়মে বিষয়টি ভিন্ন।

ধরুন শাকসবজি, মাছ বা চাল বিক্রি হচ্ছে, যেগুলো প্রথম তফসিল অনুযায়ী ভ্যাটমুক্ত।

পণ্য ভ্যাটমুক্ত হলেও মার্কেটপ্লেসের সার্ভিস ফি বা কমিশন কিন্তু ভ্যাটমুক্ত নয়।

তাই কমিশনের ওপর ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য থাকবে।

মার্কেটপ্লেসকে কি মূসক চালান রাখতে হবে?

না।

যেহেতু মার্কেটপ্লেস নিজে পণ্য কেনাবেচা করে না, তাই পণ্য বিক্রয়ের জন্য মূসক চালান সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়।

তবে ভ্যাট কর্মকর্তার প্রয়োজনে প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত লেনদেনের তথ্য সরবরাহ করতে হবে।

সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক তালিকা

বিষয় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা মার্কেটপ্লেস
পণ্যের মালিকানা নিজস্ব না
ভ্যাট হার ৭.৫% ১৫%
ভ্যাট প্রযোজ্য পণ্য বিক্রয় কমিশন/সার্ভিস ফি
মূসক-৪.৩ প্রয়োজন নেই প্রযোজ্য নয়
মূসক চালান সংরক্ষণ করতে হবে পণ্য বিক্রয়ে বাধ্যতামূলক নয়

কারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে?

  • Facebook Seller
  • নিজস্ব E-commerce Website মালিক
  • Daraz Seller
  • Chaldal Merchant
  • অনলাইন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী
  • Marketplace Operator

বিশেষ করে যারা অনলাইনে নিয়মিত পণ্য বিক্রি করেন, তাদের এখন ভ্যাট কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

উপসংহার

ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬ সংক্রান্ত নতুন NBR নির্দেশনা বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যবসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

এই নির্দেশনার মাধ্যমে অনলাইন খুচরা বিক্রেতা এবং মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারীদের ভ্যাট কাঠামো আলাদা করে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দ্বৈত করের ঝুঁকি কমাবে এবং ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে।

আপনি যদি অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাহলে এখনই আপনার ভ্যাট নিবন্ধন, হিসাবরক্ষণ এবং কর পরিকল্পনা নতুন নিয়ম অনুযায়ী হালনাগাদ করা উচিত।

FAQ

অনলাইন খুচরা বিক্রেতার ভ্যাট কত?

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী অনলাইন খুচরা বিক্রেতার ভ্যাট হার ৭.৫%।

Daraz কি পুরো পণ্যমূল্যের ওপর ভ্যাট দেয়?

না। Daraz শুধুমাত্র কমিশন বা সার্ভিস চার্জের ওপর ১৫% ভ্যাট দেয়।

ভ্যাটমুক্ত পণ্য বিক্রিতে কমিশনের ওপর ভ্যাট লাগবে?

হ্যাঁ। পণ্য ভ্যাটমুক্ত হলেও মার্কেটপ্লেসের কমিশন বা সার্ভিস ফি ভ্যাটযোগ্য।

মূসক-৪.৩ কি অনলাইন বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক?

না। নতুন আদেশ অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক নয়।

Facebook Page থেকে বিক্রি করলে কি নতুন নিয়ম প্রযোজ্য?

হ্যাঁ। যদি আপনি অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নতুন ভ্যাট নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.