দীর্ঘ প্রায় ১৪ মাস পর আবারও দেশব্যাপী শুরু হতে যাচ্ছে জাতীয় ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন। শিশুদের অন্ধত্ব প্রতিরোধ, অপুষ্টি দূরীকরণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই বিশেষ কর্মসূচি পরিচালিত হবে। এবারের ক্যাম্পেইনে দেশের ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ বিরতির পর এই কর্মসূচি চালু হওয়ায় শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন করে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ভিটামিন এ গ্রহণ শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোন বয়সী শিশুরা ভিটামিন এ ক্যাপসুল পাবে?
এবারের ক্যাম্পেইনে দুইটি বয়সভিত্তিক গ্রুপকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
- ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশু: নীল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল
- ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশু: লাল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ জন এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৮ জন।
দেশজুড়ে প্রস্তুত ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্র
ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এগুলো মূলত ইপিআই (EPI)-এর নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্র।
এছাড়া যাতায়াত সহজ করতে দেশের বিভিন্ন লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, রেলস্টেশন ও বাসস্টেশনে আরও ৫০০টি মোবাইল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
দুর্গম অঞ্চলে অতিরিক্ত কার্যক্রম
দেশের ১২টি জেলার ৫৮টি উপজেলার ২৯০টি ইউনিয়নের ৭১৪টি ওয়ার্ডের দুর্গম এলাকায় মূল ক্যাম্পেইনের পর আরও চার দিন ‘চাইল্ড টু চাইল্ড সার্চিং’ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এই কার্যক্রমের মাধ্যমে যেসব শিশু মূল দিনে ক্যাপসুল গ্রহণ করতে পারবে না, তাদের খুঁজে বের করে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন কর্মসূচি
আগামী ২৮ জুন সকালে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার উপস্থিত থাকবেন।
মাঠপর্যায়ে থাকবে বিশেষ তদারকি
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।
এছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে।
১৪ মাস পর কেন হচ্ছে এই ক্যাম্পেইন?
সাধারণত বছরে দুইবার জাতীয় ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ক্যাপসুল সরবরাহ সংকটের কারণে গত বছরের মার্চ মাসের পর আর কোনো ক্যাম্পেইন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রায় ১৪ মাস পর আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মসূচি শুরু হচ্ছে, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভিটামিন এ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন এ শিশুদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান।
- অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
- দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়
- শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে
- শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ নিশ্চিত করে
বাংলাদেশে ভিটামিন এ কর্মসূচির ইতিহাস
বাংলাদেশে শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে ১৯৭৩ সালে ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রাথমিকভাবে এটি ‘জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে জাতীয় টিকাদান দিবসের সঙ্গে এই কর্মসূচি যুক্ত করা হয়।
২০০৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’ রাখা হয় এবং ২০১১ সালে এটি জাতীয় পুষ্টিসেবা (NNS)-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান সকল অভিভাবকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, পরিবারের ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের নির্ধারিত দিনে নিকটস্থ কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ছোট্ট ভিটামিন এ ক্যাপসুল শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কোনো শিশুকে যেন এই কর্মসূচির বাইরে রাখা না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।