বর্ষা মৌসুমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা এখন নিত্যদিনের সমস্যা। অনেক সময় হাঁটুসমান বা কোমরসমান পানির মধ্য দিয়েই গাড়ি চালাতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অসাবধানতাবশত গাড়ির কেবিন বা ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ইঞ্জিনে পানি প্রবেশ করলে হাইড্রোলক (Hydrolock) হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নষ্ট করে লাখ টাকার ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তবে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। নিচে বর্ষাকালে গাড়িতে পানি ঢুকলে কী করবেন এবং কী করবেন না, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
গাড়িতে পানি ঢুকলে প্রথমে কী করবেন?
- গাড়ি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান।
- ইঞ্জিনে পানি ঢুকেছে সন্দেহ হলে স্টার্ট দেবেন না।
- কেবিনে জমে থাকা পানি দ্রুত বের করুন।
- ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করুন।
- এয়ার ফিল্টার ও ইঞ্জিন অয়েল পরীক্ষা করান।
- প্রয়োজনে সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করুন।
ইঞ্জিনে পানি ঢুকেছে সন্দেহ হলে স্টার্ট দেবেন না
পানির মধ্যে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই বারবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটি সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। যদি ইঞ্জিনের সিলিন্ডারের ভেতরে পানি ঢুকে থাকে, তাহলে স্টার্ট দেওয়ার সময় পিস্টন, কানেক্টিং রড ও ক্র্যাঙ্কশ্যাফট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে জোর করে স্টার্ট না দিয়ে টো-ট্রাক বা অন্য গাড়ির সাহায্যে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান এবং দক্ষ মেকানিক দিয়ে পরীক্ষা করান।
কেবিনে পানি জমে থাকলে দ্রুত বের করুন
গাড়ির ভেতরে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে দুর্গন্ধ, ছত্রাক, মরিচা এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ক্ষতি হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব দরজা খুলে পানি বের করে ফেলুন।
এরপর মাদুর, কার্পেট ও সিটের নিচের অংশ শুকনো কাপড় অথবা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সাহায্যে পরিষ্কার করুন।
ব্যাটারির সংযোগ পরীক্ষা করুন
পানি বৈদ্যুতিক অংশে পৌঁছালে শর্ট সার্কিট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিরাপদ মনে হলে ব্যাটারির নেগেটিভ টার্মিনাল খুলে রাখুন। এরপর নিচের বিষয়গুলো পরীক্ষা করুন।
যেসব ইলেকট্রনিক অংশ পরীক্ষা করা জরুরি
- হেডলাইট
- টেইল লাইট
- পাওয়ার উইন্ডো
- ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম
- হর্ন
- সেন্ট্রাল লকিং
Related Posts
যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে পরীক্ষা করান।
এয়ার ফিল্টার পরীক্ষা করুন
ইঞ্জিনে পানি প্রবেশ করেছে কি না তা বোঝার অন্যতম সহজ উপায় হলো এয়ার ফিল্টার পরীক্ষা করা। যদি এয়ার ফিল্টার ভেজা থাকে, তাহলে পানি ইঞ্জিনে ঢোকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তাই ফিল্টার খুলে পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে নতুন ফিল্টার ব্যবহার করুন।
ইঞ্জিন অয়েল ও অন্যান্য তরল পরীক্ষা করুন
ইঞ্জিন অয়েলের সঙ্গে পানি মিশে গেলে অয়েলের রং দুধের মতো ঘোলাটে হয়ে যায়। এমন অবস্থায় গাড়ি চালানো একেবারেই উচিত নয়।
যেসব ফ্লুইড পরীক্ষা করবেন
- ইঞ্জিন অয়েল
- গিয়ার অয়েল
- ব্রেক ফ্লুইড
- কুল্যান্ট
- পাওয়ার স্টিয়ারিং ফ্লুইড
প্রয়োজন হলে এসব তরল পরিবর্তন করুন এবং ইঞ্জিন ভালোভাবে পরীক্ষা করান।
পানির মধ্য দিয়ে চালানোর পর ব্রেক শুকিয়ে নিন
গভীর পানির মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালানোর পর ব্রেক কিছু সময়ের জন্য কম কার্যকর হতে পারে। নিরাপদ ও ফাঁকা রাস্তায় ধীরে ধীরে কয়েকবার ব্রেক চাপলে ডিস্ক ও ব্রেক প্যাড শুকিয়ে যায় এবং ব্রেকিং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
কেবিন সম্পূর্ণ শুকানো জরুরি
গাড়ির দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে ব্লোয়ার, ফ্যান অথবা ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন।
কার্পেট ও সিট সম্পূর্ণ শুকানোর আগে ব্যবহার করলে পরে দুর্গন্ধ, ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। তাই কেবিন পুরোপুরি শুকানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ষাকালে গাড়ি চালানোর সময় অতিরিক্ত সতর্কতা
- হাঁটুর বেশি পানি থাকলে গাড়ি চালানো এড়িয়ে চলুন।
- পানির গভীরতা না বুঝে প্রবেশ করবেন না।
- ধীরে ও একই গতিতে গাড়ি চালান।
- সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
- বৃষ্টির সময় হেডলাইট ব্যবহার করুন।
- বন্যা বা তীব্র জলাবদ্ধ এলাকায় গাড়ি পার্ক করবেন না।
উপসংহার
বর্ষাকালে সামান্য অসতর্কতায় গাড়ির ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক সিস্টেম ও কেবিনের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ইঞ্জিনে পানি ঢুকেছে সন্দেহ হলে কখনোই স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বরং নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে লাখ টাকার ক্ষতি থেকে আপনার গাড়িকে সহজেই রক্ষা করা সম্ভব।
প্রশ্ন: গাড়ির ইঞ্জিনে পানি ঢুকেছে সন্দেহ হলে কী প্রথমে স্টার্ট দেওয়া উচিত?
উত্তর: না। ইঞ্জিনে পানি ঢুকেছে সন্দেহ হলে কখনোই স্টার্ট দেবেন না। এতে হাইড্রোলক হয়ে পিস্টন, কানেক্টিং রড ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিরাপদ স্থানে টো করে নিয়ে গিয়ে সার্ভিস সেন্টারে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।