ফুটবল বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের অর্থ নিয়ে আলোচনা হলেও রেফারিরা কত আয় করেন, তা অনেকেরই অজানা। অথচ বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে ম্যাচ পরিচালনা করা একজন রেফারির জন্য যেমন বিশাল সম্মানের, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকও।
বিশ্বকাপে নির্বাচিত হতে একজন রেফারিকে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, ফিটনেস পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং ফিফার বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়। এসব যোগ্যতা অর্জনের পরই তারা বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পান।
বিশ্বকাপে রেফারি কীভাবে নির্বাচিত হন?
বিশ্বকাপে রেফারি হওয়া সহজ নয়। একজন রেফারির ক্যারিয়ার সাধারণত স্থানীয় বা জেলা পর্যায়ের ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের লাইসেন্স অর্জন করে দেশের শীর্ষ লিগে ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে হয়।
জাতীয় ফেডারেশনের সুপারিশে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারি তালিকায় জায়গা পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক ম্যাচ, মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে ফিফা বিশ্বকাপের জন্য রেফারি নির্বাচন করে।
বিশ্বকাপের আগে বিশেষ প্রশিক্ষণ
বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার পরও কাজ শেষ নয়। নির্বাচিত রেফারিদের প্রায় এক থেকে দুই বছর ধরে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এই প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকে—
- ফিটনেস টেস্ট
- ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) প্রশিক্ষণ
- ম্যাচ সিমুলেশন
- কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট
- দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন
Related Posts
একজন রেফারিকে কতটা দৌড়াতে হয়?
ফিফার রেফারিদের অন্যতম বড় যোগ্যতা হলো অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা। একজন প্রধান রেফারি একটি ম্যাচে গড়ে ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ান। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই দূরত্ব ১৪ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এটি শুধু সাধারণ দৌড় নয়। ম্যাচ চলাকালে রেফারিদের স্প্রিন্ট, জগিং, ব্যাকওয়ার্ড রান এবং সাইডওয়ে মুভমেন্ট করতে হয়, যাতে তারা সবসময় বলের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারেন।
ফিফার ফিটনেস পরীক্ষায় কী থাকে?
আন্তর্জাতিক রেফারিদের নিয়মিত কয়েকটি কঠিন শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
- ৪০ মিটার স্প্রিন্ট
- Repeated Sprint Test
- High-speed Interval Run
- Yo-Yo Endurance Test
এসব পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ হারাতে পারেন একজন রেফারি।
রেফারির দায়িত্ব কী?
রেফারির কাজ শুধু ফাউল ধরা নয়। ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তার হাতেই থাকে।
- ম্যাচ শুরু ও শেষের বাঁশি বাজানো
- ফ্রি-কিক ও পেনাল্টির সিদ্ধান্ত
- হলুদ ও লাল কার্ড দেখানো
- অতিরিক্ত সময় নির্ধারণ
- VAR পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া
- প্রয়োজনে ম্যাচ স্থগিত বা বাতিল করা
বিশ্বকাপে একজন প্রধান রেফারি কত টাকা পান?
সাম্প্রতিক ফিফা বিশ্বকাপগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রধান রেফারি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক পান।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬০ লাখ থেকে ৮৫ লাখ টাকা।
এছাড়া প্রতিটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন একজন প্রধান রেফারি।
| রেফারির ধরন | টুর্নামেন্ট ফি | ম্যাচপ্রতি পারিশ্রমিক |
|---|---|---|
| প্রধান রেফারি | ৫০,০০০–৭০,০০০ ডলার | ৩,০০০–৫,০০০ ডলার |
| সহকারী রেফারি | ২৫,০০০–৩৫,০০০ ডলার | ২,০০০–৩,০০০ ডলার |
সব মিলিয়ে একজন প্রধান রেফারি একটি বিশ্বকাপে ১ কোটি টাকারও বেশি আয় করতে পারেন।
সহকারী রেফারিরা কত পান?
সহকারী রেফারিদের টুর্নামেন্ট ফি ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার।
এছাড়া প্রতি ম্যাচ পরিচালনার জন্য তারা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ডলার পান। পাশাপাশি ফিফা তাদের ভ্রমণ, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করে।
VAR রেফারিদের ভূমিকা
বর্তমানে বিশ্বকাপে মাঠের বাইরে একটি পূর্ণাঙ্গ VAR টিম কাজ করে।
এই দলে থাকেন—
- ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)
- সহকারী VAR
- অফসাইড VAR
- রিপ্লে অপারেটর
তারা বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রধান রেফারিকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রধান রেফারির।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা রেফারি
ইতালির পিয়েরলুইজি কোলিনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত রেফারিদের একজন। টাকমাথা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
তিনি ২০০২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করেছিলেন। বর্তমানে তিনি ফিফার Refereeing Committee-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
উপসংহার
বিশ্বকাপে একজন রেফারির দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফল বদলে দিতে পারে। তাই ফিফা শুধু অভিজ্ঞ ও দক্ষ রেফারিদেরই এই দায়িত্ব দেয়। কঠোর প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তার বিনিময়ে তারা যেমন বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করেন, তেমনি পান আকর্ষণীয় পারিশ্রমিকও। টুর্নামেন্ট ফি, ম্যাচপ্রতি পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে একজন প্রধান রেফারির আয় সহজেই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।