করমুক্ত আয় ৫ লাখ ও সর্বোচ্চ করহার ২৫% করার প্রস্তাব ডিসিসিআই’র
ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। পাশাপাশি নন-লিস্টেড কোম্পানির করহার লিস্টেড কোম্পানির মতো ২৫ শতাংশ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে করপোরেট কর রিটার্ন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অটোমেটেড করার সুপারিশও করা হয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ডিসিসিআই, চ্যানেল-২৪ এবং দৈনিক সমকাল যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিতি
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ-এর সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মনজুর হোসেন, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ ও রিজওয়ান রাহমানসহ বিভিন্ন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
কর ব্যবস্থায় ডিজিটাল সংস্কারের প্রস্তাব
ডিসিসিআই তাদের প্রস্তাবনায় কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে একাধিক সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে পিএসআর ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করতে ইটিডিএস প্ল্যাটফর্ম বাধ্যতামূলক করা এবং তা এনবিআর-এর ই-ট্যাক্স পোর্টালের সঙ্গে সমন্বয় করা।
এছাড়া ভ্যাট ব্যবস্থায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে ভ্যাট ব্যবস্থাপনা করতে পারেন। একই সঙ্গে অগ্রিম ভ্যাট ব্যবস্থা পুরোপুরি বিলুপ্ত করে চূড়ান্ত পণ্য বা সেবার মূল্যের ওপর ভ্যাট নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
আমদানি ও কর কাঠামো সহজীকরণ
ডিসিসিআই বলছে, আমদানি পর্যায়ে আগাম কর উৎপাদনকারীদের জন্য ধাপে ধাপে তুলে দেওয়া উচিত এবং বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য তা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এতে করে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং ব্যবসা সহজ হবে।
তারা আরও প্রস্তাব করেছে, সিঙ্গেল স্টেপ রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করে ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজ করতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা অযথা জটিলতায় না পড়েন।
বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সুদহার যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ডিসিসিআই। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের জন্য দেশীয় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
উৎপাদনশীল খাতে পুনঃঅর্থায়ন, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজার ও কর্পোরেট গভর্নেন্স
ফিনান্সিয়াল ও নন-ফিনান্সিয়াল সেক্টরে কর্পোরেট গভর্নেন্স জোরদার করার সুপারিশ করেছে ডিসিসিআই। একই সঙ্গে নতুন আইপিও বৃদ্ধি, বড় প্রতিষ্ঠান ও এসএমইকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্ড চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিল্প খাতে বিশেষ প্রস্তাবনা
চামড়া শিল্প উন্নয়নে কার্যকর সিইটিপি স্থাপন, ইটিপি স্থাপনে সহজ ঋণ এবং কৃষিপণ্যের জন্য কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে ফার্মাসিউটিক্যাল, আইসিটি, ইলেকট্রনিক্স ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে পেটেন্ট সুবিধা এবং প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ খাত
সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তুলতে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছে ডিসিসিআই।
এছাড়া উৎপাদনমুখী সিএমএসএমই খাতে কম সুদে (৫-৬%) ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তার সুপারিশ করা হয়েছে।
অবকাঠামো ও জ্বালানি খাত
অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড, সুকুকসহ বিভিন্ন ফাইন্যান্সিং মডেল চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনতে রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ডেটা সুরক্ষা
প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নে মিতব্যয়িতা এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সেবা খাতে তথ্য সুরক্ষার জন্য উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন ডেটা সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন মেগা প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
Related Posts
উপসংহার
ডিসিসিআই’র প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের কর ব্যবস্থা সহজতর হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কর হার হ্রাস এবং ডিজিটালাইজেশন অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।