এআই চালাতে সমুদ্রের নিচে ডেটা সেন্টার বানালো চীন, বিদ্যুৎ আসছে বায়ুশক্তি থেকে

চীন সমুদ্রের নিচে তৈরি করেছে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক এআই ডেটা সেন্টার। বায়ুশক্তিচালিত এই প্রকল্পে কমবে বিদ্যুৎ খরচ ও কার্বন নিঃসরণ।
china-underwater-ai-data-center

এআই চালাতে সমুদ্রের নিচে ডেটা সেন্টার বানালো চীন, বিদ্যুৎ আসছে বায়ুশক্তি থেকে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা। এই চাহিদা মেটাতে এবার অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে চীন। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে দেশটি সমুদ্রের নিচে তৈরি করেছে অত্যাধুনিক এআই ডেটা সেন্টার, যা সরাসরি বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে।

চীনের শাংহাই উপকূলের লিংকাং বিশেষায়িত অঞ্চলের কাছে অফশোর প্ল্যাটফর্মে স্থাপন করা হয়েছে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক আন্ডারওয়াটার ডেটা সেন্টার। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের এআই অবকাঠামো উন্নয়নে এটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে যখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই চালাতে বিশাল বিদ্যুৎ খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন চীনের এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব ও শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির নতুন উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশও এই মডেল অনুসরণ করতে পারে।

কেন সমুদ্রের নিচে তৈরি করা হলো ডেটা সেন্টার?

এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের ফলে সার্ভার পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এর বড় কারণ হবে এআইভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার।

সাধারণ ডেটা সেন্টারে বিদ্যুতের বড় একটি অংশ সার্ভার ঠান্ডা রাখতে খরচ হয়। অনেক ক্ষেত্রে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কুলিং সিস্টেমেই ব্যয় হয়। কিন্তু সমুদ্রের নিচে গড় তাপমাত্রা কম থাকায় প্রাকৃতিকভাবেই সার্ভার ঠান্ডা রাখা সম্ভব হয়।

এই কারণেই চীন সমুদ্রের নিচে ডেটা সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও কমানো সম্ভব হবে।

কোথায় তৈরি হয়েছে এই আন্ডারওয়াটার ডেটা সেন্টার?

চীনের শাংহাই উপকূলের লিংকাং বিশেষায়িত অঞ্চলের কাছে অফশোর প্ল্যাটফর্মে এই অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার নিচে অবস্থিত।

ডেটা সেন্টারটিতে চারটি স্তরে মোট ১৯২টি সার্ভার র‌্যাক স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন এর বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ২ দশমিক ৩ মেগাওয়াট।

প্রকল্পটি পূর্ণমাত্রায় চালু হলে বিদ্যুৎ ব্যবহার ২৪ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডেটা সেন্টারের মূল বৈশিষ্ট্য

বিষয় তথ্য
অবস্থান শাংহাই উপকূল, লিংকাং অঞ্চল
গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার নিচে
সার্ভার র‌্যাক ১৯২টি
বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহার ২.৩ মেগাওয়াট
পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ ব্যবহার ২৪ মেগাওয়াট

বিদ্যুৎ আসছে বায়ুশক্তি থেকে

ডেটা সেন্টারটি নিকটবর্তী ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ৫০টির বেশি উইন্ড টারবাইন রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো ব্যবস্থার ৯৫ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ আসছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে। ফলে এটি কার্বন নিঃসরণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চীনের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণমাত্রায় চালু হলে বছরে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হবে।

সমুদ্রের নিচে ডেটা সেন্টারের বড় সুবিধা কী?

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রাকৃতিক কুলিং ব্যবস্থা। সমুদ্রের ঠান্ডা পানি সার্ভারের তাপমাত্রা কম রাখতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত এয়ার কন্ডিশনিং বা কুলিং সিস্টেমের প্রয়োজন অনেক কম পড়ে।

এর ফলে বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কম হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শক্তি সাশ্রয়ী ডেটা সেন্টার নির্মাণে এই প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সমুদ্রের নিচে ডেটা সেন্টারের সুবিধা

  1. প্রাকৃতিক কুলিং সুবিধা
  2. কম বিদ্যুৎ খরচ
  3. কার্বন নিঃসরণ হ্রাস
  4. পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো
  5. দীর্ঘমেয়াদে খরচ সাশ্রয়
আরও পড়ুন

নির্মাণে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল?

সমুদ্রের নিচে এত বড় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ সহজ ছিল না। প্রকৌশলীদের সমুদ্রের প্রবল ঢেউ, পানির চাপ এবং সমুদ্রতলের পলি জমার মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।

এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য নতুন ধরনের নির্মাণপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুরো নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় ছয় মাস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প আরও বাড়লে সমুদ্রভিত্তিক প্রযুক্তি অবকাঠামোর নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে।

এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব কতটা?

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিপুল বিনিয়োগ করছে। ChatGPT, Gemini কিংবা অন্যান্য এআই সেবার জন্য বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হচ্ছে।

এর ফলে শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এআই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা।

সেই বাস্তবতায় চীনের এই আন্ডারওয়াটার ডেটা সেন্টার প্রকল্প ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অবকাঠামোর নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে পরিবেশবান্ধব ডেটা সেন্টারের চাহিদা

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণও।

এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন পরিবেশবান্ধব ও কম বিদ্যুৎ খরচের সমাধান খুঁজছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক কুলিং এবং কম কার্বন প্রযুক্তির ব্যবহার তাই দ্রুত বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে পরিবেশবান্ধব ডেটা সেন্টার প্রযুক্তি বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে।

উপসংহার

এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের যুগে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় চীনের সমুদ্রের নিচে বায়ুশক্তিচালিত ডেটা সেন্টার প্রকল্প প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে।

শক্তি সাশ্রয়, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টার অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে আরও দেশ এই ধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

চীনের আন্ডারওয়াটার ডেটা সেন্টার কোথায় তৈরি হয়েছে?

শাংহাই উপকূলের লিংকাং বিশেষায়িত অঞ্চলের কাছে এটি তৈরি করা হয়েছে।

ডেটা সেন্টারটি কত গভীরে স্থাপন করা হয়েছে?

এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার নিচে স্থাপন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে?

নিকটবর্তী বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উইন্ড টারবাইন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

সমুদ্রের নিচে ডেটা সেন্টারের সুবিধা কী?

প্রাকৃতিক কুলিং ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ খরচ ও কার্বন নিঃসরণ কমে যায়।

প্রকল্পটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এটি ভবিষ্যতের এআই অবকাঠামোকে আরও পরিবেশবান্ধব ও শক্তি সাশ্রয়ী করতে সহায়তা করবে।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.