ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনছে সরকার, মিলবে ডিজিটাল ও হয়রানিমুক্ত সেবা

বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ও অটোমেটেড করছে সরকার। অনলাইনে নামজারি, খাজনা, খতিয়ানসহ মিলবে সহজ ও হয়রানিমুক্ত ভূমিসেবা।
digital-land-service-bangladesh

ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনছে সরকার, মিলবে ডিজিটাল ও হয়রানিমুক্ত সেবা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জমি সংক্রান্ত জটিলতা, দখলদারিত্ব, নামজারি ভোগান্তি এবং হয়রানির অভিযোগ সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় সমস্যাগুলোর একটি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, মামলা ও প্রতারণার কারণে অনেক কৃষক ও সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর দুর্ভোগে পড়েন। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, জমির প্রকৃত মালিক যেন তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন এবং ভূমি ব্যবস্থায় কোনো ধরনের দখলদারিত্ব না থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ভূমি সুরক্ষা এবং কৃষকদের জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে সরকার এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

সোমবার সচিবালয়ে ‘ভূমিসেবা মেলা ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

কেন ভূমি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে সরকার?

বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিক নিজের জমির ন্যায্য অধিকার পেতেও বছরের পর বছর আদালত ও সরকারি অফিসে ঘুরেছেন। দালালচক্র, জটিল কাগজপত্র এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

ভূমিমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন সেই পুরোনো পরিস্থিতি বদলাতে চায়। জনগণ যেন দ্রুত, সহজ এবং স্বচ্ছভাবে ভূমিসেবা পায়, সেটিই এখন মূল লক্ষ্য।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল ও অটোমেটেড করা হবে, যাতে হয়রানি ও অনিয়ম কমে আসে।

ডিজিটাল ভূমিসেবায় কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে দেশের ভূমিসেবার বড় অংশ ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এখন অনেক সেবা ঘরে বসেই অনলাইনে নেওয়া যাচ্ছে।

বর্তমানে ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, অনলাইনে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, ডাকযোগে ভূমিসেবা এবং ডিসিআর ফি প্রদানসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটালভাবে চালু রয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর এসব সেবার কারণে সাধারণ মানুষের সময় ও খরচ কমছে। একই সঙ্গে কমছে দালাল নির্ভরতা ও দুর্নীতির সুযোগ।

বর্তমানে যেসব ডিজিটাল ভূমিসেবা চালু আছে

  1. ই-নামজারি
  2. অনলাইনে খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান
  3. অনলাইনে খতিয়ান সংগ্রহ
  4. মৌজা ম্যাপ ডাউনলোড
  5. ডাকযোগে ভূমিসেবা
  6. ডিসিআর ফি অনলাইনে পরিশোধ

৮৯৩টি সার্ভিস সেন্টার থেকে মিলবে ভূমিসেবা

ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এখন থেকে দেশের ৮৯৩টি সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে মানুষ ভূমিসেবা নিতে পারবেন।

এর ফলে সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো কাজের জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে যেতে হবে না। স্থানীয় পর্যায়েই অনেক সেবা পাওয়া যাবে।

সরকারের মতে, এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি সেবাপ্রাপ্তি আরও সহজ হবে।

সেবা বর্তমান অবস্থা
ই-নামজারি অনলাইনে চালু
খাজনা প্রদান ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা
খতিয়ান সংগ্রহ অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে
মৌজা ম্যাপ ডিজিটাল ডাউনলোড
সার্ভিস সেন্টার ৮৯৩টি চালু

ভূমিসেবা মেলা ২০২৬ কী?

সরকার ১৯ থেকে ২১ মে পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী সারাদেশে ‘ভূমিসেবা মেলা ২০২৬’ আয়োজন করেছে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের পাশাপাশি ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ভূমি ভবনেও এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনাঃ সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ”।

মেলায় নাগরিকদের সরাসরি বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়া হবে এবং অনলাইন সেবা ব্যবহারের পদ্ধতিও শেখানো হবে।

মেলায় যেসব কার্যক্রম থাকবে

  1. ভূমিসেবা প্রদান
  2. অনলাইন সেবা শেখানো
  3. অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধান
  4. কুইজ প্রতিযোগিতা
  5. জনসচেতনতামূলক সেমিনার
  6. সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
আরও পড়ুন

ভ্রাম্যমাণ ভূমিসেবা ভ্যানও চালু হচ্ছে

সাধারণ মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে ভ্রাম্যমাণ ভূমিসেবা ভ্যান চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ভ্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নাগরিকদের সেবা দেওয়া হবে।

এছাড়া “ভূমি আমার ঠিকানা” শীর্ষক বুকলেট, লিফলেট ও স্টিকারও বিতরণ করা হবে।

সরকারের লক্ষ্য হলো, প্রযুক্তিনির্ভর ভূমিসেবা সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো এবং সেবা সহজ করা।

ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় কী সুবিধা হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটালাইজেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জমি সংক্রান্ত দুর্নীতি, দালালচক্র ও হয়রানি অনেকাংশে কমে আসবে।

মানুষ ঘরে বসেই অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পেলে সময় এবং খরচ দুটোই কমবে।

এছাড়া জমির রেকর্ড ডিজিটাল হলে প্রতারণা ও জালিয়াতির ঝুঁকিও কমে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। নইলে অনলাইন ব্যবস্থার আড়ালেও নতুন ধরনের অনিয়ম তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তবেই সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থে হয়রানিমুক্ত ভূমিসেবা পাবে।

সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ভূমি সংক্রান্ত সব সেবা ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অটোমেটেড করা। এজন্য একাধিক প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ভূমিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে দ্রুত ও নির্ভুল সেবা নিশ্চিত করা যায়।

প্রযুক্তিনির্ভর ভূমি ব্যবস্থাপনা কার্যকর হলে দেশের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপসংহার

বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের ভূমি জটিলতা ও হয়রানি কমাতে সরকার এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। ডিজিটাল ও অটোমেটেড ভূমিসেবা চালু হলে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই অনেক সেবা নিতে পারবেন।

ভূমি সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা গেলে জমি সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সুশাসন ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

এখন কি অনলাইনে নামজারি করা যায়?

হ্যাঁ, বর্তমানে ই-নামজারি সেবা অনলাইনে চালু রয়েছে।

খাজনা কি অনলাইনে দেওয়া যায়?

হ্যাঁ, ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা এখন অনলাইনে পরিশোধ করা যায়।

মোট কতটি সার্ভিস সেন্টার চালু হয়েছে?

দেশজুড়ে ৮৯৩টি সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছে।

ভূমিসেবা মেলা ২০২৬ কতদিন চলবে?

১৯ থেকে ২১ মে পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে।

ডিজিটাল ভূমিসেবার সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?

সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি দুর্নীতি ও দালাল নির্ভরতা কমবে।

Post a Comment

To avoid SPAM, all comments will be moderated before being displayed.
Don't share any personal or sensitive information.