ইতালিতে আরও ৮ হাজার ৮৬৫ সিজনাল ওয়ার্ক পারমিট অনুমোদন, নতুন সুযোগ বাংলাদেশিদেরও
কৃষি ও পর্যটন খাতে তীব্র শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি সরকার। ২০২৬ সালের ডিক্রেটো ফ্লাসি (Decreto Flussi) কর্মসূচির আওতায় নতুন করে আরও ৮ হাজার ৮৬৫টি সিজনাল ওয়ার্ক পারমিট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে ইতালিতে কাজের অপেক্ষায় থাকা হাজারো বিদেশি কর্মীর সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কর্মীদের জন্য এই ঘোষণা ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালির কৃষি, হোটেল, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইতালির সরকারি সূত্রে নিশ্চিত তথ্য
ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয়, দেশটির অফিসিয়াল গ্যাজেট এবং আন্তর্জাতিক ভিসা ও ইমিগ্রেশন–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত এই কোটা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রকাশ করা হয় ৬ মে।
কোন খাতে কতটি পারমিট দেওয়া হয়েছে?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন কোটার মধ্যে—
- কৃষি খাত: ৫ হাজার ৩৮৯টি সিজনাল পারমিট
- পর্যটন ও আতিথেয়তা খাত: ৩ হাজার ৪৭৬টি পারমিট
গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে কৃষিকাজ এবং পর্যটন খাতে অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হওয়ায় এই বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইতালির কর্তৃপক্ষ।
কেন বাড়ছে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা?
প্রতি বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন এবং পর্যটন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন স্থানীয় শ্রমিক সংকট পূরণে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হয় দেশটিকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপজুড়ে জনসংখ্যা সংকট এবং স্থানীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে বিদেশি কর্মীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ইতালিও সেই বাস্তবতার অংশ।
বাংলাদেশিদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সুযোগ?
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে যান। ইতালির শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য।
বিশেষ করে কৃষি, রেস্টুরেন্ট, হোটেল এবং সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ভালো চাহিদা রয়েছে। নতুন এই অতিরিক্ত কোটা ঘোষণার ফলে অনেক বাংলাদেশি কর্মী বৈধভাবে ইতালিতে কাজের সুযোগ পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুরোনো আবেদনকারীদের জন্য সুখবর
চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত “ক্লিক ডে”-তে আবেদন করেও যারা কোটা সংকটের কারণে সুযোগ পাননি, তাদের আবেদন পুনর্বিবেচনার আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে ইতালির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এটি অনেক আবেদনকারীর জন্য বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ হাজার হাজার আবেদনকারী আগে থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।
নতুন আবেদনকারীরাও আবেদন করতে পারবেন
শুধু পুরোনো আবেদনকারীরাই নন, নতুন আবেদনকারীরাও এই সুযোগের আওতায় আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদন প্রক্রিয়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মানতে হবে।
- ইতালির বৈধ নিয়োগকর্তার মাধ্যমে আবেদন করতে হবে
- নিয়োগকর্তাকেই ওয়ান-স্টপ ইমিগ্রেশন পোর্টালে কাগজপত্র জমা দিতে হবে
- শ্রমিকের থাকার জায়গা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকর্তার
- ইতালিতে পৌঁছানোর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে
দ্রুত আবেদন করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত এই কোটা দীর্ঘদিন খোলা নাও থাকতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইতালির অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া কোটাগুলো খুব দ্রুত পূরণ হয়ে যায়।
উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে একই ধরনের অতিরিক্ত কোটা ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই আবেদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই আগ্রহীদের দ্রুত আবেদন প্রস্তুত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দালালচক্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশে কাজের সুযোগের খবর প্রকাশের পর অনেক সময় দালালচক্র সক্রিয় হয়ে পড়ে। তারা ভুয়া চাকরির অফার এবং অতিরিক্ত খরচের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।
তাই আবেদনকারীদের শুধুমাত্র বৈধ ও সরকারি অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কোনো মধ্যস্থতাকারীকে টাকা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইউরোপের শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সংকট বাড়তে থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ইতালি ইতোমধ্যে কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন এবং সেবাখাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিকদের জন্য ইউরোপের শ্রমবাজার আরও উন্মুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ কথা
ইতালিতে নতুন করে আরও ৮ হাজার ৮৬৫টি সিজনাল ওয়ার্ক পারমিট অনুমোদনের ঘোষণা বিদেশে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এটি হতে পারে ইউরোপের শ্রমবাজারে প্রবেশের নতুন সম্ভাবনা।
তবে দ্রুত আবেদন প্রস্তুত করা, বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং দালালচক্র থেকে সতর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।