আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে “শূন্য রিটার্ন” জমা দেওয়ার সুযোগ বাতিল করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আসন্ন জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যদিও নতুন ব্যবস্থায় ন্যূনতম করের পরিমাণ কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
শূন্য রিটার্ন কী?
বর্তমানে দেশে অনেক করদাতা বার্ষিক আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী আয়কর রিটার্ন জমা দেন।
এই ধরনের রিটার্নকে সাধারণভাবে “শূন্য রিটার্ন” বলা হয়। অর্থাৎ করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন দাখিল করা হয়, কিন্তু কোনো কর পরিশোধ করতে হয় না।
এটি অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিয়মিত রিটার্ন জমা দিলে—
- ট্যাক্স রেকর্ড ঠিক থাকে
- ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া সহজ হয়
- ভিসা ও আর্থিক লেনদেনে সুবিধা পাওয়া যায়
- সরকারি বিভিন্ন কাজে ট্যাক্স রিটার্ন ব্যবহার করা যায়
কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে এনবিআর?
এনবিআরের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে “শূন্য রিটার্ন” সুবিধা সীমিত বা পুরোপুরি বাতিল হতে পারে।
এর ফলে যাদের আয় করযোগ্য সীমার নিচে, তাদেরও ন্যূনতম কর দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও কত টাকা ন্যূনতম কর নির্ধারণ করা হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
একইসঙ্গে আগামী বাজেটে কর কাঠামোতেও একাধিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব যানবাহনে কর ছাড়ের পরিকল্পনা
আগামী বাজেটে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (EV) বা বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে কর কমানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও কর ছাড় বা বিশেষ সুবিধা দিলে পরিবেশ রক্ষা ও জ্বালানি ব্যয় কমাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে বাড়তে পারে নতুন কর
তবে একই সময়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ফলে একদিকে কর ছাড়, অন্যদিকে নতুন কর আরোপ—দুই ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের আভাস মিলছে।
করদাতাদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য রিটার্ন বাতিল করা হলে বিপুলসংখ্যক করদাতাকে ন্যূনতম করের আওতায় আসতে হতে পারে।
এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তে পারে, তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপও তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করলেও আয় কম হওয়ার কারণে কর দিতেন না, তারা নতুন ব্যবস্থায় আর্থিক চাপে পড়তে পারেন।
ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় বাড়ছে করদাতার সংখ্যা
এনবিআর সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছর থেকে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করায় করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রায় ৫০ লাখ ব্যক্তি অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।
ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনার ফলে এখন করদাতাদের তথ্য আরও সহজে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
সরকার কেন কর বাড়াতে চাইছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম।
রাজস্ব বাড়াতে সরকার এখন কর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে চাইছে।
সেই কারণেই করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ন্যূনতম কর কাঠামো চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
তবে ব্যবসায়ী ও সাধারণ করদাতাদের একাংশ মনে করছেন, শূন্য রিটার্ন বাতিলের আগে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক মানুষ আর্থিক সংকটে রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত কর চাপ সৃষ্টি করলে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
কর বিশ্লেষকদের মতামত
কর বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্য রক্ষা করা।
একদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি করা যাবে না।
তাই বাজেটে করনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবতা, আয় বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অনলাইনে রিটার্ন ব্যবস্থার ইতিবাচক দিক
অনলাইনে রিটার্ন বাধ্যতামূলক হওয়ায় কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগে অনেক করদাতা রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়াকে জটিল মনে করলেও এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তুলনামূলক সহজে কাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে।
এনবিআর ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর পরিকল্পনাও করছে।
শেষ কথা
আগামী বাজেটে আয়কর ব্যবস্থা, ডিজিটাল রিটার্ন, পরিবেশবান্ধব যানবাহন এবং নতুন ন্যূনতম করনীতি নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে “শূন্য রিটার্ন” সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে সেটি দেশের লাখো করদাতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন করদাতা, ব্যবসায়ী এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর রয়েছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।
📌 সূত্র: এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্র ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন।