ভিসার জন্য সিকিউরিটি ডিপোজিট এখন পাঠানো যাবে ব্যাংকের মাধ্যমে
ভিসা বন্ড ও রিফান্ডযোগ্য সিকিউরিটি ডিপোজিট পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভিসা আবেদনকারীদের জন্য বড় সুবিধা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১১ মে ২০২৬ তারিখে জারি করা FEPD-1 সার্কুলার নং-০৯ অনুযায়ী, এখন থেকে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো সরাসরি দূতাবাস বা হাইকমিশনে আবেদনকারীর পক্ষে ভিসা বন্ড বা সিকিউরিটি ডিপোজিটের অর্থ পাঠাতে পারবে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বা ভার্চুয়াল কার্ডের মাধ্যমেও এই অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি বা ভ্রমণের জন্য ভিসা আবেদন করতে গিয়ে যেসব বাংলাদেশি নাগরিক আগে জটিলতার মুখোমুখি হতেন, তাদের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনেক সহজ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো বৈধ ও নিরাপদ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ভিসা আবেদনকারীদের আর্থিক লেনদেন সহজ করা। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভিসা বন্ড ও সিকিউরিটি ডিপোজিট কী?
অনেক দেশ ভিসা অনুমোদনের আগে আবেদনকারীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে জমা রাখতে বলে। এই অর্থকে সাধারণত ভিসা বন্ড বা রিফান্ডযোগ্য সিকিউরিটি ডিপোজিট বলা হয়।
মূল উদ্দেশ্য হলো, ভিসাধারী ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ে নিজ দেশে ফিরে আসবেন কি না, সেটি নিশ্চিত করা। আবেদনকারী ভিসার শর্ত মেনে চললে নির্দিষ্ট সময় পর এই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।
আগে এই অর্থ পাঠানোর জন্য বাংলাদেশি আবেদনকারীদের অনেক সময় জটিল ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হতো। নতুন সার্কুলারের ফলে এখন পুরো প্রক্রিয়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
ব্যাংকের মাধ্যমে কীভাবে ভিসা বন্ড পাঠানো যাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো এখন আবেদনকারীর পক্ষে সরাসরি দূতাবাস, হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অর্থ পাঠাতে পারবে।
এছাড়া ব্যাংক চাইলে আবেদনকারীর নামে আন্তর্জাতিক বা ভার্চুয়াল কার্ড ইস্যু করতে পারবে, যেখানে নির্ধারিত বন্ড বা সিকিউরিটি ডিপোজিটের অর্থ আগে থেকেই লোড করা থাকবে। যাদের ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ট্রাভেল কার্ড রয়েছে, তাদের কার্ডেও প্রয়োজনীয় অর্থ রিলোড করা যাবে।
তবে এই অর্থ শুধুমাত্র ভিসা সংক্রান্ত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ভিসা বন্ড পাঠানোর অনুমোদিত উপায়
- সরাসরি ব্যাংক রেমিট্যান্স
- নতুন আন্তর্জাতিক কার্ড ইস্যু
- ভার্চুয়াল কার্ড ব্যবহার
- বিদ্যমান ট্রাভেল কার্ড রিলোড
| পদ্ধতি | সুবিধা |
|---|---|
| সরাসরি রেমিট্যান্স | দূতাবাসে সরাসরি অর্থ পাঠানো |
| আন্তর্জাতিক কার্ড | সহজ অনলাইন পেমেন্ট |
| ভার্চুয়াল কার্ড | নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন |
| কার্ড রিলোড | বিদ্যমান কার্ডে অর্থ যোগ করা |
কোন কোন কাগজপত্র লাগবে?
ভিসা বন্ড বা সিকিউরিটি ডিপোজিট পাঠানোর আগে ব্যাংককে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল যাচাই করতে হবে। আবেদনকারীর বৈধ পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক।
এছাড়া দূতাবাস, হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা অফিসিয়াল ডিমান্ড লেটার, ইনভয়েস বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক দলিল জমা দিতে হবে। সেখানে বন্ডের পরিমাণ, মুদ্রার ধরন এবং রিফান্ডের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
ভিসা আবেদন রেফারেন্স নম্বর বা আবেদন গ্রহণের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংক অতিরিক্ত সহায়ক দলিলও চাইতে পারে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- বৈধ পাসপোর্ট
- ডিমান্ড লেটার বা ইনভয়েস
- ভিসা আবেদন রেফারেন্স নম্বর
- রিফান্ড শর্ত উল্লেখ থাকা দলিল
- অন্যান্য সহায়ক কাগজপত্র
আরও পড়ুন
ERQ ও RFCD অ্যাকাউন্টধারীরাও সুবিধা পাবেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যাদের ERQ (Exporters Retention Quota) অথবা RFCD (Resident Foreign Currency Deposit) অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তারাও এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।
এসব অ্যাকাউন্টে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার ব্যালেন্স ব্যবহার করে ভিসা বন্ড বা সিকিউরিটি ডিপোজিট পাঠানো যাবে। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ইস্যু করা আন্তর্জাতিক কার্ডও এই কাজে ব্যবহার করা যাবে।
তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট পরিচালনার নিয়ম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
রিফান্ডের অর্থ কীভাবে দেশে ফেরত আসবে
দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন ভিসা বন্ড বা সিকিউরিটি ডিপোজিটের অর্থ ছাড় করবে, তখন সেই অর্থ দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত আনতে হবে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি লেনদেনের জন্য আলাদা রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হবে এবং রিফান্ডের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্রয়োজন হলে ব্যাংক আবেদনকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ দেশে ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় ফলোআপ করবে।
ব্যাংকের জন্য কী কী নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশ ব্যাংক এই সুবিধা চালুর পাশাপাশি অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর জন্য বেশ কিছু বাধ্যবাধকতাও নির্ধারণ করেছে। প্রতিটি লেনদেন নিয়মিত রিপোর্টিংয়ের আওতায় থাকবে।
ব্যাংকগুলোকে AML/CFT অর্থাৎ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন রোধ সংক্রান্ত নীতিমালা মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি প্রযোজ্য কর আইন ও অন্যান্য বিধিনিষেধও অনুসরণ করতে হবে।
প্রতিটি ভিসা বন্ড ও রিফান্ডযোগ্য সিকিউরিটি ডিপোজিট লেনদেনের জন্য পৃথক রেজিস্টার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদেশগামীদের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পড়াশোনা, চাকরি বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশে যান। অনেক দেশের ভিসা আবেদনে সিকিউরিটি ডিপোজিট বা বন্ড জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
আগে এই অর্থ পাঠাতে অনেকে অনানুষ্ঠানিক বা জটিল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতেন। নতুন সার্কুলারের ফলে এখন বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নিরাপদে অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিদেশগামী বাংলাদেশিদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়াতেও সহায়ক হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই সার্কুলার ভিসা বন্ড ও রিফান্ডযোগ্য সিকিউরিটি ডিপোজিট পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, নিরাপদ ও আনুষ্ঠানিক করেছে। এখন আবেদনকারীরা সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে দূতাবাসে অর্থ পাঠাতে পারবেন এবং আন্তর্জাতিক বা ভার্চুয়াল কার্ডের সুবিধাও নিতে পারবেন।
যারা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং ভিসার জন্য সিকিউরিটি ডিপোজিট দেওয়ার প্রয়োজন হবে, তাদের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তারিত জানতে নিজের ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ভিসা বন্ড কী?
ভিসা অনুমোদনের আগে দূতাবাসে জমা রাখা জামানতকেই ভিসা বন্ড বলা হয়।
কোন ব্যাংকের মাধ্যমে এই সুবিধা পাওয়া যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত যেকোনো ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
ভার্চুয়াল কার্ড ব্যবহার করা যাবে কি?
হ্যাঁ, নতুন সার্কুলার অনুযায়ী ভার্চুয়াল কার্ড ব্যবহার করে ভিসা বন্ড পরিশোধ করা যাবে।
ERQ ও RFCD অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ, এসব অ্যাকাউন্টের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে ভিসা বন্ড পাঠানো যাবে।
রিফান্ডের অর্থ দেশে ফেরত আনতে হবে কি?
হ্যাঁ, দূতাবাস থেকে অর্থ ফেরত পেলে তা দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।