বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবায় কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই অ্যাপ স্টোর ও গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ কেনা, সাবস্ক্রিপশন নেওয়া কিংবা ইন-অ্যাপ পেমেন্টের ক্ষেত্রে সরকারি ভ্যাট (VAT) যুক্ত হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রযুক্তি অঙ্গন, অনলাইন ব্যবহারকারী এবং ডিজিটাল ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
কেন আনা হচ্ছে নতুন ভ্যাট ব্যবস্থা?
দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার ডিজিটাল লেনদেনের ওপর কর কাঠামো আরও সুসংগঠিত করতে কাজ করছে।
এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে হওয়া অ্যাপ ও সাবস্ক্রিপশন পেমেন্টে ভ্যাট যোগ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি, তবে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
কোন কোন সেবায় বাড়তে পারে খরচ?
বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক ব্যবহারকারী নিয়মিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করছেন।
নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে নিচের সেবাগুলোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভ্যাট যোগ হতে পারে—
- YouTube Premium
- Google One
- Netflix
- Spotify
- iCloud Storage
- Gaming Subscription
- AI Tools Subscription
- App Purchase ও In-App Payment
অর্থাৎ এখন যে মূল্যে সাবস্ক্রিপশন কেনা হয়, ভবিষ্যতে তার সঙ্গে অতিরিক্ত কর যুক্ত হতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও রয়েছে ডিজিটাল ট্যাক্স
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবার ওপর ভ্যাট বা ডিজিটাল ট্যাক্স আরোপ করেছে।
কারণ অনলাইনভিত্তিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে এসব লেনদেন থেকে সরকার সরাসরি রাজস্ব পাচ্ছে না।
বাংলাদেশও এখন সেই কর কাঠামোকে আধুনিক করার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে কেন বাড়ছে ডিজিটাল পেমেন্ট?
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, দেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বাড়ার কারণে অ্যাপভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
শুধু বিনোদন নয়, এখন অনেকেই নিচের সেবাগুলোতে মাসিক সাবস্ক্রিপশন ব্যবহার করছেন—
- অনলাইন শিক্ষা
- ক্লাউড স্টোরেজ
- ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার
- ডিজাইন টুল
- অফিস সফটওয়্যার
- AI Tools ও Productivity Apps
ফলে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্টের পরিমাণও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ কোথায়?
অনেকেই এই উদ্যোগকে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বাড়তি খরচ নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে যারা নিয়মিত বিদেশি অ্যাপ বা ডিজিটাল সেবার সাবস্ক্রিপশন ব্যবহার করেন, তাদের মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর প্রভাব
প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ডিজাইনার এবং অ্যাপ ডেভেলপারদের অনেকেই আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার ও ক্লাউডভিত্তিক সেবার ওপর নির্ভরশীল।
যদি এসব সেবার ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট যুক্ত হয়, তাহলে তাদের কাজের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ডিজিটাল ভ্যাট আরোপ করা হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই স্বচ্ছ ও ব্যবহারবান্ধব পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।
কারণ অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হলে অনেক ব্যবহারকারী বিকল্প বা অননুমোদিত পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এতে বৈধ ডিজিটাল লেনদেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কর ব্যবস্থাকেও আধুনিক করা প্রয়োজন।
তবে একইসঙ্গে এমন নীতি নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত না হয়।
বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবহারে পরিবর্তন
বাংলাদেশে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
ডুয়েল কারেন্সি কার্ড এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সুবিধা সহজ হওয়ায় এখন অনেক তরুণ সরাসরি বিদেশি ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করছেন।
ফলে অ্যাপ স্টোর ও প্লে স্টোরভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় আকার ধারণ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর ওপর কর আরোপ স্বাভাবিক বিষয়। আবার অনেকে মনে করছেন, অতিরিক্ত ভ্যাটের কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীদের খরচ আরও বেড়ে যাবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল লেনদেনের জন্য একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক কর কাঠামো তৈরি করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের সময় ব্যবহারকারীদের স্বার্থ, প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখনো সরকারিভাবে চূড়ান্ত নির্দেশনা বা ভ্যাটের হার প্রকাশ করা হয়নি। তাই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের অপেক্ষা করতে হবে।
📌 সূত্র: গণমাধ্যম প্রতিবেদন ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সূত্র।